Friday, December 1, 2017

গরীব কাহারে কয়১৫ - উন্নয়নের বিশ্ব রাজনীতি তত্ত্ব

এনকাউন্টারিং ডেভেলাপমেন্টঃ দ্য মেকিং এন্ড আন্মেকিং অব দ্য থার্ড ওয়ার্লডঃ আর্তুরো এসকোবারএর বই থেকে

দ্বিতীয় অধ্যায়
নতুন বাজারের খোঁজ এবং নিরাপদ লড়ায়ের ক্ষেত্র

১৯৩৯ সালে পানামায় অনুষ্ঠিত, Inter-American Conference of Foreign Ministers বৈঠক, আমেরিকিয় রাষ্ট্রগুলির নিরপেক্ষতা ঘোষণা করল। সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকা বলল যদি রাষ্ট্রগুলির মধ্যের যৌথতাকে রক্ষা করতে হয়, তাহলে লাতিন আমেরিকার শান্তির সময়ের আর্থ ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা ঢেলে সাজাতে সে অর্থনৈতিক ভাবে দেশগুলিকে সাহায্য করতে প্রস্তুত। এই দিকে এগোনোর প্রথম দিশায় ১৯৪০ সালের জানুয়ারি মাসে Inter-American Development Commission তৈরি হল, যাতে লাতিন আমেরিকার দেশগুলির পণ্যগুলি আমেরিকার বাজার ধরতে পারে। যদিও এই সময়ে লাতিন আমেরিকাকে আমেরিকার আর্থসাহায্য তুলনামূলকভাবে পরিমিত থাকলেও এই পদক্ষেপের গুরুত্ব ছিল। দুটি সংগঠন, Export-Import Bank এবং Reconstruction Finance Corporation তৈরি করে এই পদক্ষেপ দৃঢভাবে নেওয়ার জন্য প্রচুর পণ্য কেনার জন্য অর্থ বিনিয়োগ করা হল। এই কাজের একটা বড় শর্ত হল বিপুল পরিমান প্রাযুক্তিক এবং পুঁজি সরবরাহ করা। এই সহযোগের চরিত্র হল লাতিন আমেরিকার বাজারগুলি আর অর্থনীতিতে আরও বিধিবদ্ধভাবে নজর নিবদ্ধ করা।
১৯৪৫ সাল বিশ্ব রাজনীতি পরিবর্তনে বড় ভূমিকা পালন করেছে। এই প্রথম গোটা পশ্চিমি জ্ঞানচর্চা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বিপুল ভূমিকা পালন করল। কিন্তু বিশ্বজোড়া এই বিশেষ সুবিধার অবস্থানেরও বিরোধিতা দ্যাখা দিল। পূর্ব ইওরোপের দেশগুলোয় আর চিনে সাম্যবা্দীরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করায় এই বিরোধিতার মাত্রা বাড়তে শুরু করে। এশিয়া আর আফ্রিকার পুরনো উপনিবেশগুলি আস্তে আস্তে স্বাধীন হচ্ছে। ফলে উপনিবেশপূর্ব লুঠ, নিয়ন্ত্রণ আর অত্যাচারের সময় পেরিয়ে আসছে দেশগুলি। এক কথায় বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্যে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আর সেই পরিবর্তনের স্বীকৃতি আসতে শুরু করল।
১৯৪৫-১৯৫৫ সালের মধ্যে বিশ্ব পুঁজিবাদের শীর্ষে উঠে এল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। এই সময় আমেরিকার উৎপন্ন পণ্য এবং উদ্বৃত্ত পুঁজি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিনিয়োজিত করার চাপ বাড়তে থাকল ক্রমশঃ। আমেরিকার অর্থনীতির বিশেষ করে সদ্য বিকশিত বহুজাতিক সংস্থাগুলির উৎপাদনের ক্ষমতাপূরণ এবং তার সঙ্গে লাভের কড়ির সিন্দুকের বহর আরও বাড়ার জন্য প্রয়োজন ছিল শস্তার কাঁচামালের নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ। যে অর্থনৈতিক চরিত্রটি উৎপাদনের ব্যবস্থার পরিবর্তন সূত্রে জায়মান হচ্ছিল, সেটি হল, খাদ্য উৎপাদন এবং কাঁচামালের মধ্যের সম্পর্কটিতে কাঁচামালের যোগান অপর্যাপ্ত নয় এবং তার জন্য উৎপাদন ব্যহত হয়, এর জন্য বিভিন্ন অনুন্নত এলাকায় কার্যকর প্রাথমিক উৎপাদন ব্যবস্থা শুরু করার যৌক্তিকতার ওপর জোর দেওয়া হল। তবুও ইওরোপিয় অর্থনীতির প্রাথমিক উদ্দেশ্য এই পর্বে ছিল পুনরুজ্জীবন। পশ্চিম ইওরোপের জন্য এই পর্বে বিপুল সাহায্য দেওয়া হয়, যা গিয়ে মিশে যায় ১৯৪৮ সালের মার্শাল পরিকল্পনায়১০।
মার্শাল পরিকল্পনাকে দ্যাখা হল ‘একটি ব্যতিক্রমী গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা(Bataille 1991)’ হিসেবে। ফরাসি অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিস পেরু (Francois Perroux)র পথ ধরে জর্জ বাটাইল(Georges Bataille) ১৯৪৮এর মার্শাল পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে বললেন, পুঁজিবাদের ইতিহাসে এই প্রথম বিনিয়োগে কোন একজন বিনিয়োগকারী বা দেশের স্বার্থের ওপরে উঠে সামাজিক স্বার্থ দ্যাখা হল। পেরুর কথা ধার করে বাটাইল বললেন, ‘(পশ্চিমী?) বিশ্বের স্বার্থে বিনিয়োগ’। ১৯৪৫-১৯৫০ পর্বে এই পরিকল্পনায় পশ্চিম ইওরোপের জন্য লাভের আইন(ল অব প্রফিট) বদল করে বরাদ্দ হল ১৯ বিলিয়ন ডলার(তবে এই সূত্রটি বলছে এই পরিমান ১২ বিলিয়ন ডলার, https://history.state.gov/milestones/1945-1952/marshall-plan)। বাটাইল বললেন এই পদক্ষেপ, ধ্রুপদী অর্থনীতির নীতি থেকে সরাসরি বিচ্যুতি এবং ‘a clear reversal of the principles of classical economics. It was "the only way to transfer to Europe the products without which the world’s fever would rise’। এই প্রথম আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বিনিয়োগ=লাভের নীতি থেকে বেরিয়ে এল the rule on which the capitalist world was based. It was necessary to deliver the goods without payment. It was necessary to give away the product of labor।
কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের জন্য কোন মার্শাল পরিকল্পনা গৃহীত হল না। লাতিন আমেরিকার জন্য বরাদ্দ হল মোট ইয়োরোপীয় দানযজ্ঞের ২ শতাংশেরও কম। গোটা তৃতীয় বিশ্বের জন্য বরাদ্দ হল ১৫০ মিলিয়ন ডলার ১৯৫৩ সালে পয়েন্ট ফোর প্রকল্পে। তৃতীয় বিশ্বকে নির্দেশ দেওয়া হল দেশি বিদেশি পুঁজি খুজে নিয়ে আসতে, যার অর্থ পুঁজি বিনিয়োগের জন্য সঠিক বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা - যে শর্তগুলির মধ্যে ছিল পুঁজিবাদের প্রতি আস্থা, জাতীয়তাবাদ, বামপন্থী, শ্রমিকশ্রেণী এবং কৃষকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ। আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন ব্যাঙ্ক(International Bank for Reconstruction and Development) বা সাধারন ভাষায় বিশ্ব ব্যাঙ্ক এবং আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার তৈরি করা কিন্তু ওপরে উল্লিখিত পুঁজিবাদের সব আইন মেনেই কাজ করতে শুরু করল।
(চলবে)

No comments: