Thursday, December 14, 2017

সুশীল চৌধুরীর কিছু ব্রিটিশ লুঠ সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গী

সুশীল চৌধুরীর প্রবন্ধটা অনুবাদ শেষ করলাম। দুটো নতুন জিনিস জানলাম, যে কথাগুলো কোনও বাংলা অর্থনীতির ছাত্র গবেষক লেখক কেন জানান না জানি না. উনি বেঁচে থাকলে প্রণাম করে আসতাম।
১) শুধু ইওরোপিয়রা বাংলায় দামি ধাতুর বিনিময়ে ব্যবসা করতেন না, বাংলা এতই উদ্বৃত্তের রাজ্য ছিল যে এখানে পণ্য কিনতে গেলে রূপো আনতেই হত। রূপো ইওরোপিয়দের তুলনায় এশিয়রা অনেক বেশি বাংলায় আনতেন।
২) ইওরোপিয়দের আন্তএশিয় ব্যবসা নিয়ে অনেক রোমান্টিসিজম হয়েছে। তাদের তুলনায় এশিয় সওদাগরদের(যাদের মধ্যে বাঙ্গালিওও প্রচুর ছিল) বাংলাজাত পণ্যের এশিয় ব্যবসা ৬/৫ গুণ বেশি ছিল। অর্থাৎ ১৭২০ সালে ডাচেরা বছরে ৩০ লক্ষ টাকার আন্তঃএশিয়া ব্যবসা করলে, বাঙ্গালি সহ এশিয়রা করত বছরে ১ কোটি টাকার ব্যবসা! আজ থেকে ৩০০ বছর আগে ১ কোটি টাকার বর্তমান মূল্য কত আন্দাজ করুণ!
তারাও বাংলার বাইরে ব্যবসা করে বাংলায় রূপো আনতেন।

সুশীলবাবু From Prosperity to Decline: Eighteenth Century Bengal বইতে বলছেন -
সাদা বাংলায় যার অর্থ...
বাংলায় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত প্রচুর বেশি ছিল। বদনাম ছিল, বাংলা ভূমিতে আসা সব সম্পদ সে শুষে নেয়। মনে রাখা দরকার শুধু ইওরোপিয়রাই রুপো আনত না, এশিয়রাও বাণিজ্য করে বাংলায় রূপো আর মুদ্রা আনত। বাংলা অতীব স্বনির্ভর ছিল। তাকে রূপো ছাড়া কিছুই প্রায় আমদানি করতে হত না। যা আমদানি করত তার মূল্য এতই অকিঞ্চিৎকর ছিল যে রপ্তানিতে কোন প্রভাবই পড়ত না।
মূল ইংরেজিটা এবারে পড়ুন-
It(বাংলা) had such a favourable balance of trade for which the exporters had to bring in bullion or cash that it had acquired the bad reputation of being the sink where everything disappeared without the least prospect of return. In this connection it is important to note that it was not only the Europeans who had to import silver but Asians too had to bring in cash or bullion to pay for their purchases. There is little doubt that Bengal as highly self-sufficient and as such, the market for any import commodity, other than silver, was severely restricted. The only commodity. imported was salt and to some extent, cotton and a few non-precious metals and luxury items,-the total value of, which was quite negligible compared to that of its exports.
আরও একটা বিষয়, রজত রায়েরদের তত্ত্ব অনুসারে পলাশী আকস্মিক ঘটনা ছিল, সুশীলবাবু স্পষ্ট বলছেন না ছিল না, ব্রিটিশেরা বহুকাল ধরে প্যাঁয়তাড়া কষছিল বাংলা দখল করতে।
There is ample evidence to show that many of the Europeans in the early 1750s were freely writing about or discussing the possibility of conquering Bengal. So it was neither by chance nor by accident that the British conquered Bengal in 1757 (Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, pp.35-37. )
খুব স্পষ্ট ভাষায় সুশীলবাবু ব্রিটিশ লুঠের কথা বলছেন, এত খোলাখুলি, এত কঠিন, এই নগ্ন করে বোধহয় কেউ বলেন নি - নরেন্দ্র কৃষ্ণ সিংহের লেখা মাথায় নিয়েই বলছি -
...Bengal was the springboard from which the British expanded their territorial acquisition and subsequently built up_the empire which gradually engulfed most parts of India and ·ultimately-many other parts of Asia as well. _In.the process, the once-prosperous province in the first half of the eighteenth century was gradually reduced to abject poverty.. Under colonial rule, it was transformed from the world's major centre of artisanal production to a mere producer of agricultural raw materials. For a proper understanding of the magnitude of the change and 'the relative position of the province before and after the British conquest: it is imperative to take up a detailed study of Bengal's trade, industries, markets and merchants in the pre-Plassey period. That is the aim of this volume. There can be little ·doubt that the traditional industries, especially the textiles and silk industries, were virtually ruined by the early nineteenth century under the aegis of colonial rule. But these were the industries which once fed'the-increasing demand of the world market in the first half of the eighteenth century.


Wednesday, December 13, 2017

উপনিবেশপুর্ব বাংলা - বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য১২

সুশীল চৌধুরী

মধ্যযুগ
এ প্রসঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা যাক পণ্য বিনিময়ের মাধ্যম। বাংলায় পণ্য কিনতে আসা ইওরোপিয়, এশিয় এমন কি দেশিয় ব্যবসায়ী বা সওদাগরকে রূপোর বিনিময়ে ব্যবসা করতে হত। ১৫১৬ সালে আমরা এমনও উদাহরন পাচ্ছি, ১৫১৬ সালে একটি বাঙ্গালি জাহাজ বার্মায় স্থানীয় কাপড় নিয়ে গিয়ে সেখানকার রূপো কিনে বাংলায় এনেছে। ১৫৫০সালে পর্তুগিজেরা ব্যবসা করতে গিয়ে এত পরিমানে বাংলায় সম্পদ এনে ঢেলে দিত যে, তারা মালাক্কায় যাওয়ার মরশুম এলেই তাদের রাজ্য গোয়ার মুদ্রার মান ওঠাপড়া করত। যদিও কোম্পানিগুলি বাংলায় পশম আর ব্রডক্লথ, টিন, দস্তা, লোহা নিয়ে আসত কিন্তু তাদের সামগ্রিক বাণিজ্যের পরিমানে এইগুলির মূল্য এবং পরিমান যতকিঞ্চিত মাত্র। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, ১৬৫০ থেকে ১৭২০ পর্যন্ত যত পণ্য তারা আমদানি করেছে তার তুলনায় দামি ধাতুর পরিমান ছিল ৮৭.৫ শতাংশ। অষ্টাদশ শতকের প্রথম দুদশকে ব্রিটিশদের আরও বেশি ৯০ থেকে ৯৪ শতাংশ। পলাশী পর্যন্ত এই ঘটনাত ব্যত্যয় হয় নি। এছাড়াও স্থলপথে এশিয় বণিকেরা বিপুয়ল পরিমানে রূপো নিয়ে বাংলায় এসেছে।
তবে পলাশীর পরে বাংলায় রূপো বা অন্যান্য দামি ধাতু আসার প্রবণতা বন্ধ হয়ে গেল। বাংলার সম্পদ লুঠে ব্রিটিশেরা বাংলার সম্পদ কিনতে শুরু করায় এবং কোম্পানির কর্মচারীরা অভিজাতদের থেকে বিপুল পরিমান ঘুষ, উপহার এবং উপঢৌকন নিতে কয়েক দশকের মধ্যেই বাংলা ইওরোপের কাছে অধমর্ন হয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীরা তাদের বাংলার ব্যবসার লভ্যাংশ বিভিন্ন ইওরোপিয় কোম্পানিয়ে লগ্নি করতে শুরু করে এবং তারা বিল ডিসকাউন্টিঙ্গের মাধ্যমে তাদের উদ্বৃত্ত লন্ডনে নিয়ে যায়। অন্যান্য ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির ব্যবসা লক্ষ্যনীয়ভাবে কমে। এশিয় ব্যবসায়ীদের ডানা ছেঁটে দেওয়া হয়।
এটা বলা দরকার সাধারণ মানুষের, গবেষকদেরও ধারনা যে বাংলায় ইওরোপিয়রা একমাত্র দামি ধাতু নিয়ে আসত। এটা সত্য নয়, বরং তাদের তুলনায় এশিয় ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমানে বাংলায় রূপো নিয়ে আসত।

পাঠ্যসূত্রঃ S Chaudhury, Trade and Commercial Organisation in Bengal, 1650-1720,Calcutta, 1975; Om Prakash, The Dutch East India Company and the Economy of Bengal, 1620-1750, Princeton, 1985; S Chaudhury, From Prosperity to Decline - Bengal in the mid-Eighteenth Century, New Delhi, 1995; Om Prakash, European Commercial Enterprise in Pre-Colonial India, Cambridge, 1998; S Chaudhury & M Morineau (ed), Merchants, Companies and Trade - Europe and Asia in the Early Modern Era, Cambridge, 1999.
(শেষ)

উপনিবেশপুর্ব বাংলা বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য১১

সুশীল চৌধুরী

মধ্যযুগ
১৬৭০এর কাছাকাছি সময়ে ইওরোপে বাংলার রেশমের ব্যবসা শুরু হওয়ায় বাংলা বাণিজ্যে বিপুল পরিমানে হতে থাকে। কিন্তু ১৬৮০সালে বাংলার কাপড় ইওরোপের বস্ত্র পরিধানের ব্যবস্থার আমূল বদল আনে। বাংলার সঙ্গে ইওরোপের বিশাল বিপুল ব্যবসা শুরু হয় যা এশিয় ব্যবসাকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে। এতদিন গ্রীষ্মে পশ্চিম ইওরোপের ধনী আর অভিজাতরা হয় মোটা ইওরপিয় রেশম আর মূলত পশমের কাপড় পরতেন। বাংলার তাঁতিরা তাদের দেখাল কি করে সুতি আর সূক্ষ্ম বাংলার রেশম ব্যক্তির দেহে স্বাচ্ছন্দ্য আনতে পারে ইওরোপের প্যাচপ্যাচে গ্রীষ্মে। এরপর থেকে মধ্য অষ্টাদশ শতকের পলাশী চক্রান্ত পর্যন্ত বাংলা হয়ে উঠল এশিয়া সব থেকে বড় উত্তমর্ণ। ডাচ আর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার সঙ্গে ইওরোপ আর এশিয়ার সামুদ্রিক ব্যবসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ন বাহন হয়ে উঠতে শুরু করে। পলাশী চক্রান্তের পরে ব্রিটিশ কোমপানির আমলারাই বাংলার মহামহিম শাসনকর্তা এবং তার পর থেকে বাংলার ব্যবসার ইতিহাস হেঁটমুণ্ডঊর্ধ্বপদ হয়ে পড়ে।
এশিয় ব্যবসায় বাংলার গুরুত্ব একটা তথ্য থেকেই প্রমান করা যায়, অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে ডাচ ভিওসি নেদারল্যান্ডে যত পরিমান উপমহাদেশিয় পণ্য পাঠাত তার ৪০ শতাংশ কিনত বাংলা থেকেই। মোট এশিয় ব্যবসার বস্ত্রপণ্যগুলির মধ্যে ৫০শতাংশ ছিল বাংলার। ভারত উপমহাদেশে ডাচেদের সামগ্রিক সামুদ্রিক ব্যবসা ক্ষেত্রে বাংলা প্রধান কর্মক্ষেত্র হয়ে ওঠে। ব্রিটিশদের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরা বাংলাকে কোম্পানির বাগানের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুল আর মুকুটের সর্বশ্রেষ্ঠ রত্ন হিসেবে গণ্য করত। ১৬৫০ থেকে ১৭২০ পর্যন্ত বাংলা ব্যবসা ক্ষেত্রে ডাচেরা ব্রিটিশদের তুলনায় প্রায় সব ক্ষেত্রেই এগিয়েছিল। আস্তে আস্তে ব্রিটিশেরা ডাচেদের সমকক্ষ হয়ে উঠতে শুরু করে, কিন্তু তাও বহুকাল পর্যন্ত ডাচেদের এশিয় ব্যবসার প্রাধান্যে তারা দাঁত ফোটাতে পারে নি। ১৭৩০এর দশক থেকে ব্রিটিশদের ইওরোপিয় ব্যবসার পরিমান বাড়তে থাকে এবং সেটি বিপুলাকারে পৌঁছায় ১৭৪০-৪৫ সাল নাগাদ। তবে সেই চল্লিশের দশকে কিছুটা কমে, আবার পঞ্চাশের দশকে বাড়তে থাকে। কিন্তু যে পরিমান ব্যবসা কমে, সেই পরিমানটি ১৭৩০-৫৫ সময়ে গড় বাংলা থেকে রপ্তানি হওয়া মোট বাৎসরিক মূল্যে কিন্তু খুব বেশি কিছু ছিল না – গড় ছিল ৪৪০০০০ স্টার্লিং পাউন্ড কমে হয় ৩.৫ লক্ষ স্টার্লিং পাউন্ড। তবে পঞ্চাশের দশকে ব্রিটিশ বাণিজ্যে যে ঘাটতি দ্যাখা যায় তা বাংলার ক্ষেত্রে পুষিয়ে যায় ডাচেদের বাণিজ্যের পরিমান বেড়ে যাওয়াতে এবং সামগ্রিকভাবে বাংলার সঙ্গে ইওরোপের মোট বাণিজ্যের অঙ্কে। ১৭৫০-৫৫ সময়ে বাংলার রপ্তানি বাণিজ্যে কোন নিম্নাভিমুখ দ্যাখা যায় নি।
১৭২০ সালের পরে ডাচেদের ইওরোপিয় ব্যবসা মার খেতে শুরু করলেও সেটি ১৭৩০ সাল নাগাদ আবার বাড়তে থাকে। তারপর থেকে ১৭৫৫ সাল পর্যন্ত বাংলা থেকে ইওরোপে পাঠানো গড় ডাচ রপ্তানির পরিমান ক্রমাগত বেড়েছে। সেই শতকের পঞ্চাশের দশকে ব্রিটিশদের ইওরোপিয় বাণিজ্য কিছুটা কমতে থাকে। উল্লেখ্য ১৭৩০ সালে ডাচেরা মোট ব্যবসায় ব্রিটিশদের পিছনে থাকলেও ক্রমশ তাদের সমান সমান হতে থাকে। ১৭৩০এর পরে কিন্তু ডাচেদের ইওরোপে রপ্তানি নিয়মিতভাবে কমতে শুরু করে। ১৭৫০এর পর প্রথম পাঁচ বছরে ইওরোপে ডাচেদের গড় রপ্তানি ছিল ২.৩ মিলিয়ন সেখানে এশিয় বাজারে তারা ব্যবসা করেছে ৩ মিলিয়ন।

এ প্রসঙ্গে বলা দরকার ইওরোপিয়দের এশিয় ব্যবসার তুলনায় মধ্য অষ্টাদশ শতকে এশিয়দের এশিয় ব্যবসার পরিমাণ অনেক বেশি ছিল। এশিয় সওদাগরেরা বাংলার কাপড় ব্যবসা করেছে বছরে গড়ে ৮ থেকে ১০ মিলিয়ন। সেই তুলনায় বাংলা বস্ত্রের ইওরোপিয়দের মোট ইওরোপিয় ব্যবসার পরিমান ছিল খুব বেশি হলে ৫ থেকে ৬ মিলিয়ন। রেশম রপ্তানিতে এশিয়দের ব্যবসা আরও গুরুত্বপূর্ন। ১৭৪৯ থেকে ১৭৫৩ পর্যন্ত এশিয় সওদাগরদের এশিয়ায় কাঁচা রেশম রপ্তানির পরিমান ছিল ৫.৫ মিলিয়ন, ১৭৫৪ থেকে ১৭৫৮ পর্যন্ত ৪.১ মিলিয়ন গড়ে। এর তুলনায় এই সময়ে ইওরোপিয়দের মোট রেশম রপ্তানি ছিল গড়ে ০.৯৮ মিলিয়ন। পলাশীপূর্ব সময়ে বাংলা থেকে এশিয় ব্যবসায়ীদের রেশম ব্যবসার পরিমান ইওরোপিয়দের তুলনায় ৪ থেকে ৫গুণ বেশি ছিল। 

উপনিবেশপুর্ব বাংলা - বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য১০

সুশীল চৌধুরী

মধ্যযুগ
বাংলা থেকে পর্তুগিজ কোম্পানি বিপুল সংখ্যক পণ্য বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য নিয়ে যেত যেমন সুতি বস্ত্র, ঘাসের তৈরি গিনঘ্যাম, বিভিন্ন রঙের রেশম, চিনি, চাল, ঘি, নীল, লম্বা লঙ্কা, সোরা, মোম, গালা, এবং অন্যান্য পণ্যদ্রব্য সামগ্রী যা বাংলায় বিপুল পরিমানে উৎপাদন হত। ভারত এবং ইস্ট ইন্ডিজের দেশগুলিতে মূল রপ্তানি ছিল চাল। পাইরাড দ্য লাভাল দেখেছেন, যখন বাংলার জাহাজ নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছত না বা জাহাজ ডুবি হত, সে সময় চাল সুমাত্রা মলুক্কাসের মত অঞ্চলগুলোয় অত্যন্ত মহার্ঘ হত এবং মন্বন্তরের আশঙ্কা ছেয়ে যেত জনগনের মধ্যে।
পর্তুগিজদের ব্যবসার পরিমান কত ছিল? তারা আড়াই শতাংশ হারে যে চুঙ্গি শুল্ক দিত পণ্যের রপ্তানির জন্য তার পরিমান ছিল ১ লক্ষ টাকা বাৎসরিক। এই হিসেবে মোটামুটি ৪০ লক্ষ টাকার বাৎসরিক ব্যবসা ছিল পর্তুগিজদের বাংলার ব্যবসায়। এই ব্যবসায় যেহেতু বিপুল লাভ ছিল, তার গোটা উপকূল এবং বৈদেশিক ব্যবসা পর্তুগিজেরা প্রায় একচেটিয়া করে নেয় এবং দেশিয় বাণিজ্যেও দেশিয় এবং অন্যান্য বিদেশিয় বণিকদের টক্কর দিতে থাকে। কিন্তু(আকবরের সাম্রাজ্ঞী মারিয়ুজ্জামানির বা হীরাবাঈএর বাণিজ্য জাহাজ রহিমি ধ্বংস করে দেওয়ায় জাহাঙ্গির তার মায়ের অপমানের বিরুদ্ধে পর্তুগিজদের দমন ছাড়া করেন। টুকটাক বিরোধ চলছিল, কিন্তু এটাই পর্তুগিজদের সঙ্গে মুঘলদের সর্বপ্রথম বড়সড় বিবাদ এবং সেই বিবাদের জের ছড়িয়ে পড়ে মুঘল সাম্রাজ্যের পরবর্তী প্রজন্মে) শাহজাহান পাদশা বাংলার নবাব কাশিম খাঁকে(যার নামে কাশিমবাজার) নির্দেশ দেন হুগলি ছাড়া করতে এবং পর্তুগিজেদের বাংলা স্বপ্নের চিরতরে সমাধি ঘটল(এবং ডাচ আর ব্রিটিশদের উত্থান সহজ হল)।
ডাচ আর ব্রিটিশদেরসপ্তদস শতের মাঝামাঝি থেকে বাংলায় ব্যবসা শুরু করে হুগলিতে কুঠি তৈরি করে। আরও পরে ১৬৮০র দিকে ফরাসীরা বাংলায় আসে। ইওরোপিয়দের মধ্যে অস্ট্রিয়া/জার্মান( the ostend company) এবং ড্যানিশ সওদাগরি কোম্পানি অষ্টাদশ শতকের প্রথমের দিকে আসে, এবং তারা খুব বেশি পরিমানে ব্যবসা করতে পারে নি। ইওরোপিয়দের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দ্বীপপুঞ্জ থেকে মশলা কিনে ইওরোপে বিক্রি করা। তারা সেই অঞ্চলে গেল নতুন বিশ্ব(আমেরিকা) থেকে লুঠ করে আনা রূপোর বিনিময়ে মশলা কিনতে। অবাক হয়ে দেখল সে সব দেশে রূপোর চাহিদা বিন্দুমাত্র নেই বরং ভারতীয় মোটা কাপড় সেখানে বিপুল আভিজাত্য হিসেবে বিক্রি হয়। তারা ভারতের দিকে জাহাজ ঘুরিয়ে নিয়ে আসে মোটা কাপড় কেনার জন্যে। পরিকল্পনা ভারতের কাপড়ের বিনিময়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলি থেকে মশলা বিনিময় করবে ধুলিদরে। প্রথমে তারা করমণ্ডল উপকূলে যায়, সেখানকার কাপড়ের বিপুল চাহিদা ছিল দক্ষিনপুর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে। কিন্তু কিছু দিন পরে দাক্ষিণাত্যে যুদ্ধের প্রকোপে আর রাজনৈতিক অস্থিরতায় করমণ্ডল উপকূলে ব্যবসা করা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কোম্পানিগুলি বাংলার দিকে নজর দিল।

বাংলায় তাদের বিপুল বৈচিত্রের কাপড় জোগাড় করার সুযোগ করে দিল। বাংলায় যেমন বিপুল পরিমানে মোটা কাপড় তৈরি হত – যার গুণমান অন্য অঞ্চলের কাপড়ের তুলনায় ভাল এবং দামেও শস্তা, তেমনি যথেষ্ট পরিমানে সূক্ষ্ম কাপড়ও উৎপাদন হত। দ্বিতীয়ত বাংলার রেশম তাদের ক্ষেত্রে বিপুল লাভের বাজার খুলে দিল ইওরোপে। এবং দিনের পর দিন ইওরোপে বাংলার রেশমের চাহিদা বাড়তে থাকে। পারসি আর ইতালিয় রেশমকে বিশ্ববাজারে পিছনে ফেলে দিল বাংলার কাশিমবাজারের রেশম – দাম আর গুণপনায়। এছাড়াও বাংলা সুবার পাটনার সরকার সারণে বিপুল পরিমানে সোরা উৎপাদন হত। এটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইওরোপে বিপুল চাহিদাসম্পন্ন পণ্য ছিল আর ইওরোপে পণ্য বহন করে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটি জাহাজ ভারি করার কাজে লাগত।ফলে কোম্পানিগুলি বাংলায় জাঁকিয়ে ব্যবসা করতে শুরু করল।

উপনিবেশপুর্ব বাংলা - বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য৯

সুশীল চৌধুরী
মধ্যযুগ
মুঘল আমলে বাণিজ্য শস্য বিশেষ করে সুতা আর রেশম বিপুলভাবে উৎপাদিত হত বাংলার বদ্বীপঅঞ্চলে। সুতা উৎপাদনের মূল কেন্দ্র ছিল ঢাকা; সেখান থেকে শুরু করে উত্তরের মালদা এবং কাশিমবাজার থেকে দক্ষিণের হুগলি এবং মেদিনীপুর পর্যন্ত। ১৯৫৮ সালে র‍্যালফ ফিচ বলছেন বাংলার সব থেকে সূক্ষ্ম আর ভাল সুতির কাপড় উৎপাদন হত সোনারগাঁওতে এবং তার তুলনা ভারতের কোন এলাকাতেই ছিল না। মুঘল রাজত্বে অঙ্গীভূত হওয়ার দরুণ বাংলার তাঁতিরা সরাসরি মুঘল পাদশাহির পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। মুঘল রাজসভার জন্য বিভিন্ন ধরণের বিভিন্ন মানের সুতি বস্ত্র তৈরি করার প্রায় একচেটিয়া বরাত পেত বাংলার তাঁতিরা। এ ছাড়াও কাশিমবাজার আর তার আশেপাশে অঞ্চলে উৎপাদিত কাঁচা রেশমের বিপুল চাহিদা ছিল বিশ্বজুড়ে।
বাংলার কৃষি এবং শিল্প উৎপাদনে বিপুল উৎসার শুধু মুঘল রাজত্বে প্রবেশ করার জন্য হয়েছে এটা ভাবলে ভুল হবে, বলা দরকার সেই সঙ্গে জুড়ে ছিল স্থলপথ এবং সমুদ্র বাণিজ্যের বিপুল বিকাশ, এবং যেহেতু বাংলা বিশ্ব বাণিজ্য শৃঙ্খলে যুক্ত হতে পেরেছিল। সুলতানি আমলের প্রথম যুগে পর্তুগিজ বাণিজ্য শক্তি বাংলার বঙ্গোপসাগর এলাকায় প্রবেশ করে মধ্য ১৫৩০এর দশকে চট্টগ্রাম আর সাতগাঁওতে বাণিজ্য কুঠি তৈরি করে। ষোড়শ শতকের শেষ দুই দশকে মুঘলেরা বাংলার হৃদকেন্দ্রে ঢুকে পড়ে এবং পর্তুগিজেরা হুগলি বন্দরকে তাদের ব্যবসা ঘাঁটি বানায়, চট্টগ্রামে তাদের বসতি বসায় এবং ঢাকার আশেপাশের অঞ্চলে বসতি এবং সওদাগরি উপনিবেশ তৈরি করে। একটা ধারনা আছে যে বাংলার সমুদ্র নির্ভর সওদাগরি বাণিজ্যে পর্তুগিজেরা পরম্পরার সওদাগরদের হাটিয়ে নিজেদের ক্ষমতা বিস্তৃত করেছিল, কিন্তু এই ধারনাটি যেমন বিন্দুমাত্রও সত্য নয়, এটা সত্যি যে, ষোড়শ শতাব্দে বাংলা জুড়ে ইওরোপিয় বণিকদের উপস্থিতি বাংলার পণ্য ও কৃষি উৎপাদনেরমাত্রা বাড়িয়েছিল।
ষোড়শ শতকের মধ্যিখানে বাংলার বন্দরগুলির মধ্যে সাতগাঁও ছিল গুরুত্বপূর্নতম। মুকুন্দরামের বয়ানে পাচ্ছি, সাতগাঁওতে বিদেশি বাণিজ্যের রমরমার কথা। তিনি বলছেন সাতগাঁওতে এত পরিমান বিদেশি বণিকদের আনাগোণা যে, সেখানকার বণিকদের আর বাণিজ্য করতে বিদেশে যেতে হয় না, তারা তাদের গদিতে বসেই বিপুলাকায় বাণিজ্য করতে পারে। বাংলার প্রধানতম বন্দর হওয়ায় সাতগাঁওতে বিশ্বের এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নানান ধরণের বণিক উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল। ১৫৩৭ পর্যন্ত এটি পর্তুগিজদের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তারা এটির নাম দিয়েছিল পোর্ত পিকেনো বা ছোট বন্দর। এমন কি ১৫৬৯ সালে সিজার ফ্রেডরিকি দেখছেন বিপুল বিশাল সুন্দরতম সাতগাঁও শহর-বন্দর( remarkable faire citie) থেকে প্রতি বছর তিরিশটা বাংলার নানান পণ্য ভর্তি জাহাজ বিদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হত।
কিন্তু ঐতিহাসিক সাতগাঁওএর সমৃদ্ধির পতন ঘটতে থাকে ঐতিহাসিক সরস্বতী নদীর খাত পলি পড়ে বুজে যেতে থাকায়। ফলে এখান থেকে নৌচলাচল নির্ভর ব্যবসা চালানো খুব মুশকিল হয়ে ওঠে। তাই স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈদেশিক ব্যবসাদার পর্তুগিজেরাও হুগলী শহরে বন্দর স্থাপন করে সরে যায়। মধ্য অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত হুগিলিই বাংলার প্রধানতম বন্দর হিসেবে কাজ করতে থাকে। যদিও দেশিয় বাণিজ্যর বিপুল অংশ হুগলিতে স্থানান্তরিত হয়ে গিয়েছিল, তবুও ১৬৩২ সাল পর্যন্ত সাতগাঁও সাম্রাজ্যের প্রধান বক্সীর দপ্তর হিসেবে কাজ করতে থাকে। ঐ বছর দপ্তরটি হুগলিতে উঠে না আসা পর্যন্ত এটি সরকারিভাবে বাংলার প্রধানতম ব্যবসাকেন্দ্র ছিল। তারপরে হুগলিই সরকারিভাবে বাংলায় বক্সীদের নিয়ন্ত্রিত প্রধান্ততম বন্দর হিসেবে চিহ্নিত হল।

পর্তুগিজদের কল্যাণে হুগলির উত্থান দ্রুত ঘটতে থাকে। বাংলার বিভিন্ন প্রধান ব্যান্ডেলের(পর্তুগিজ ভাষায় বাণিজ্য কুঠি) মধ্যে হুগলি শহর সব থেকে প্রধানতম দর্শনীয়, জনবহুল এবং স্বচ্ছলতম বন্দরের হিসেবে উঠে আসে। ১৫৩৩ সালে ফাদার জন কাব্রাল লিখলেন হুগলি এই বাংলার পণ্যের প্রদর্শনী স্থান হিসেবে গড়ে উঠেছে। এবং এই বন্দর থেকে পর্তুগিজ ভারতের প্রধানতম জাহাজগুলি চিন মালাক্কা এবং ম্যানিলার দিকে মুহুর্মুহু রওনা হয় এবং সারাইও হয়ে থাকে। স্থানীয় বাণিজ্যের সঙ্গে জুড়ে থাকা দেশিয় মানুষদের কথা উল্লেখ করে বলছেন, হিন্দুস্তানি, মোগোল, ফারসি এবং আরমেনিয়রা এইখানে পণ্য কিনতে আসে। ১৫৮০ সালে ভ্যান  Linschoten এবং র‍্যালফ ফিচ লিখছেন হুগলির সমৃদ্ধির বর্ণনা। ১৫৯৬-৯৭ আইনিআকবরি লেখা শেষ হয় এবং এটিতে উল্লিখিত হচ্ছে সাতগাঁওয়ের তুলনায় হুগলির সমৃদ্ধির তথ্য। পর্তুগিজদের বাংলা ব্যবসার উন্নতি যখন চরম শিখরে, সে সময়ে মনরিকের লেখায় আবশ্যিকভাবে হুগলির উপস্থিতি এবং সেটির সঙ্গে সঙ্গে বাংলার সমৃদ্ধি আর পর্তুগিজ ব্যবসার বর্ননা। দক্ষিণ ভারত(অর্থাৎ সুমাত্রা, বোর্নিও, মলুক্কাস ইত্যাদি) এলাকা থেকে বিপুল পরিমানে কাজ করা রেশম যেমন ব্রোকেড, ব্রোকাটেল, কাপড়, মলমল, দামাস্ক, সাটিন, টাফেটা মসলিন ইত্যাদি আমদানি করে। তারা বোর্নিওর দ্বীপগুলি থেকে লবঙ্গ, জায়ফল জয়িত্রী ইত্যাদি আমদানি করত বান্দা থেকে আর অসম্ভব দামি কর্পুর আমদানি করত মোর্নিওর দ্বীপগুলি থেকে। মালদ্বীপ থেকে তারা বাংলায় আনত কড়ি যা সে সময় বাংলায় খুচরো মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হত। বড় ধরণের সমুদ্রিক ঝিনুক আর শাঁখ('chanquo') আনত তুতিকোরিন এবং তিনেভেল্লির উপকূল থেকে। গোলমরিচ মালাবার, দারচিনি আনত শ্রীলঙ্কা থেকে। চিন থেকে আনত বিপুল পরিমান চিনামাটির তৈজস, মুক্তো আর গয়না, বিছানার পাশে রাখা টেবইল, টেবিল, বাক্স, সিন্দুক, লেখার টেবল ইত্যাদি। বাংলায় বিপুল চাহিদাওয়ালা সালোর(মালেশিয়া) এবং তিমোর রাজত্ব থেকে আনত সাদা আর লাল চন্দনকাঠ। 

উপনিবেশপুর্ব বাংলা - বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য৮

রণবীর চক্রবর্তী

বিনিময় মাধ্যম
অনেকেই ভেবেছেন চুর্ণি হল শুদ্ধ সোনা বা রূপোর গুঁড়ো। সে সময়কার তথ্যসূত্রে একটা বিষয় পরিষ্কার হয় যে পুরাণ অর্থাৎ রূপো আর সুবর্ণ অর্থাৎ সোনার মাপেই এই দামি ধাতু গুঁড়ো বিনিময় মাধ্যম হিসেবে বিক্রি হত। এই গুঁড়ো মুদ্রা ব্যবসায়ীদের কাছে তখনই গুরুত্বপূর্ণ বিনিময় মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, যখন তাঁরা অনুভব করেন, চলতি মুদ্রার মান আর মুদ্রায় ধাতুর শুদ্ধতায় ঘাটতি দ্যাখা দিচ্ছে, অথবা সেগুলি পাওয়া সহজ হচ্ছে না। সোনা রূপোর চুর্ণি মুদ্রা, সোনা রূপোর দিনার/সুবর্ণ বা দ্রম্ম/কর্ষাপণের সঙ্গে বিনিময় করা যেত; বা পুরাণ বা সুবর্ণের ওজনের চুর্ণি কপর্দক বা কড়ির সঙ্গে বিনিময় করা যেত। ওপরের আলোচনা থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার যে মধ্যযুগের শুরুতে জটিল আর্থব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হচ্ছিল। ত্রি স্তরীয় আর্থব্যবস্থার আমরা আন্দাজ পাচ্ছি – এক্কেবারে ভূমিতলে থাকত কড়ি বা কপর্দক, দামি ধাতুর মুদ্রা মধ্যিখানে এবং সর্বোচ্চ স্তরে নতুন ভাবনার গুঁড়ো মুদ্রা।
(বইসূত্রঃBarrie M Morrison, Political Centres and Cultural Regions in Early Bengal, Jaipur, 1980; BN Mukherjee, 'Kharoshti and Kharoshti-Brahmi Inscriptions from West Bengal (India)', Indian Museum Bulletin, 25, 1990; External Trade of North-Eastern India, New Delhi, 1992; Vimala Begley, 'Ceramic Evidence of Pre-Periplus Trade on the Indian Coast', in Vimala Begley & Richard Daniel de Puma, ed, Rome and India, the Ancient Sea Trade, Delhi, 1992; Ranabir Chakravarti, 'Maritime Trade and Voyages in Ancient Bengal', Journal of Ancient Indian History, Calcutta, 1996, 145-71; BN Mukherjee, Coins and Currency Systems of Early Bengal,Calcutta, 2000; Niharranjan Ray, Bangalir Itihas (in Bangla) Calcutta, 1404 BS.

সুশীল চৌধুরী - মধ্যযুগ
অতীতের মতই মধ্যযুগেও ব্যপ্ত ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ ছিল বাংলা জুড়ে। মুসলমান শাসনের প্রথম যুগেই বাংলার বিপুল বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদন বিদেশে বাণিজ্য করে বিপুল সম্পদ বাংলায় আসত। একটি সূত্র থেকে জানতে পারছি, ১৪১৪ খ্রিষ্টাব্দে চিন থেকে দামি ধাতু যেমন সোনা রূপোর সঙ্গে সঙ্গে সাটিন(মলমল), রেশম এবং চিনামাটির তৈজস বাংলায় আসত। অন্য একজন চৈনিক ভ্রমণকারি লিখছেন যে বাংলা এবং চিনের মধ্যে বিপুল বাণিজ্য সম্পাদিত হত রূপোর টঙ্কার বিনিময়ে।
পরের শতেও একই অবস্থা ছিল। ভেনিসের ভ্রমনকারী সেজার দ্য ফ্রেড্রিকি ১৫৬৯ সালে লিখছেন, পেগুর (বার্মা) ব্যবসায়ীরা বাংলায় অন্য কোন পণ্য নয় শুধুই সোনা আর রূপো আমদানি করত। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার বাংলার অর্থনীতিতে ক্রমশঃ মুদ্রার প্রভাব বাড়তে থাকার জন্য বাংলার বদ্বীপ পণ্য উৎপাদন এবং রপ্তানি অঞ্চল ধীরে ধীরে ভারত মহাসাগরীয় ব্যবসা শৃঙ্খলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। দশম শতে মুসলমান আক্রমনের বহু আগে থেকেই বস্ত্র রপ্তানি পণ্যের মধ্যে অন্যতম ছিল, কিন্তু সেই সময় শুরু থেকে বস্ত্রের উৎপাদনে বৈচিত্র এবং বাণিজ্য দক্ষতাও নাটকীয়ভাবে বেড়েছিল। ত্রয়োদশ শতকে মার্কোপোলো বাংলার সুতির ব্যবসায়িক গুরুত্ব প্রকাশ করেছিলেন। ১৩৪৫ সালে ইবন বতুতা সূক্ষ্ম মসলিনের বাজার জাত হওয়ার দক্ষতাকে পিঠচাপড়ানি দিয়েছিলেন।

মধ্য যুগে সুতি বস্ত্র আর চাল ছিল বাংলার মূল রপ্তানি দ্রব্য। বাংলার দুটি তৎকালীন দুটি সমুদ্র ব্যবসা উপযোগী বন্দর পূর্বের চট্টগ্রাম আর পশ্চিমের সাতগাঁও ভারত মহাসাগরীয় ব্যবসায় আষ্টেপৃষ্টে লিপ্ত ছিল – এক দিকে পশ্চিম উপকূলের গোয়া অন্য দিকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মলুকাস পর্যন্ত তাদের ব্যবসা জাল ছড়ানো ছিল। ১৫৮০ সালে র‍্যালফ ফিচ বলছেন বাংলা থেকে বিপুল পরিমান তুলো রপ্তানি হচ্ছে এবং তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যাচ্ছে বাংলার চাল পেগু, শ্রিলঙ্কিয়া, মালাক্কা, সুমাত্রা এবং অন্যান্য এলাকাতেও। কিন্তু সবথেকে বড় বর্ণনা পাচ্ছি পাইরার্ড দা লাভালের বর্ণনা থেকে। তিনি ১৬০৭ সালে চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন। তিনি সেখানে বিপুল চালের আড়ত দেখে লিখলেন, বাংলার চাল যে শুধু বাংলার বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে তাই নয়, গোয়া, মালাবার, সুমাত্রা, মলুক্কাস এবং সুন্দা দ্বীপের বাসিন্দাদের খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখতে মায়ের ভূমিকা নিয়েছে। মুঘল আমলে উৎপাদিত চালের একটা বড় অংশ উদ্বৃত্ত হত এবং মুঘল আমলে এই পরিমানটা বেড়েছিল। মনরিকে ১৬২৯ সালে বলছেন, সারা বছর ১০০টার বেশি চাল এবং অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য ভর্তি বিশালাকায় জাহাজ বাংলার বন্দরগুলি থেকে ছেড়ে সেই পণ্য রপ্তানির জন্য বিভিন্ন দেশের বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তবে ১৬৭০ সালের পরে পূর্ব দিকের বাণিজ্যে ঘাটতি দ্যাখা দিয়েছিল। 

Tuesday, December 12, 2017

উপনিবেশপুর্ব বাংলা - বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য৭

রণবীর চক্রবর্তী

বিনিময় মাধ্যম
টাঁকশাল থেকে ছাপা হয়ে বেরিয়ে আসা ধাতুমুদ্রার যুগের আগে আমাদের আলোচ্য সময়ে তৃতীয় খ্রিষ্টপূর্বের পূর্বে মূলত পণ্যই বিনিময় মাধ্যম হিসেবে কাজ করত। উত্তরভারতে ষষ্ঠ খ্রিষ্টপূর্ব এবং বাংলার বিভিন্ন বানিজ্য কেন্দ্র যেমন মহাস্থানগড়, বানগড়, চন্দ্রকেতুগড়, মঙ্গল্কোট, তাম্রলিপ্তি ইত্যাদিতে তৃতীয় খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ছাপা মুদ্রার( punch-marked coins) আবির্ভাব লক্ষ্য করা যায়। সম্প্রতি উয়াড়ি-বটেশ্বরে ছাপা মুদ্রা পাওয়া যাওয়ায় এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে সেই পূর্ব বঙ্গবদ্বীপ অঞ্চলেও অর্থমাধ্যমে ব্যবসা হত এবং এই ব্যবসার রমরমা ছিল। রৌপ্য মুদ্রা কার্ষাপণ মাপকে ছিল ৩২ রতি বা ৫৭.৬ গ্রেন।
তৃতীয় খ্রিষ্টপূর্বে বাংলায় মুদ্রার ব্যবহারের অর্থ হল তার আগেই বাংলা ব্যবসা বিশ্ব বিপুলভাবে প্রবেশ করেছে। শিলালেখতে উল্লিখিত পুণ্ড্রনগরে কোসাওর মুদ্রাকোষ গণ্ডা আর কাকিনি দিয়ে ভরার অর্থ করছেন কিছু গবেষক, যে এই দুটি ধরণের মুদ্রার প্রচলন ছিল সে সময়। অন্য এক দল গবেষকের বক্তব্য গণ্ডা, মাপ আদতে কড়ির সংখ্যার বর্ণনা। দ্বিতীয় ধারনা ধরে এগোলেও আমরা বুঝতে পারি যে আমাদের আলোচ্য সময়ে কিন্তু পণ্য বিনিময় মাধ্যম ছিল কোন অন্য মাধ্যম। সেটা কিন্তু কড়িই। তৃতীয় খ্রিপূতে রূপোর ছাপা মুদ্রার পাশাপাশি দ্বিতীয় খ্রিপূতে তামা আর সোনার(বুলিয়ন) মুদ্রাও চালু হয়। গোটা এককের মুদ্রার পাশাপাশি অর্ধ এবং একচতুর্থাংশ এককের  মুদ্রাও পাওয়া গিয়েছে। এই uninscribed তামার মুদ্রার ভিত্তি ছিল রূপোর কর্ষাপণ। Die-struck মুদ্রার আবির্ভাব বাংলায় হয় কুষাণ আমলে। নিম্ন রাঢ় এবং বঙ্গে দ্বিতীয় খ্রি সময়ে ছাপা তামার মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে – এগুলির নাম দেওয়া হয়েছে কুষাণ-রাঢ/কুষান-বঙ্গ মুদ্রা এবং এগুলি ওডিসায়(কলিঙ্গ) আবিষ্কৃত পুরী-কুষাণ মুদ্রার অনুরূপ। এর থেকে আমরা আরেকটি সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে বঙ্গ-কলিঙ্গ একই ব্যবসা শৃঙ্খলায় যুক্ত ছিল।
পঞ্চম এবং ষষ্ঠ শতকের প্রথমপাদে রাজনৈতিকভাবে গুপ্ত সাম্রাজ্যের বাংলায় উপস্থিতির ফলে এই অঞ্চলে গুপ্ত আমলে মুদ্রার প্রাদুর্ভাব ঘটে। এবং এই মুদ্রাগুলির আঙ্গিক অসাধারণ চমৎকার। উত্তরবঙ্গে আবিষ্কৃত বহু গুপ্ত তাম্রলিপিতে এই সময়ের ম্যুদ্রার নাম পাওয়া যায় – দিনার এবং রূপক। এই দুই শব্দের অর্থ হল গুপ্ত যুগের সোনা আর রূপোর মুদ্রা। এই তাম্রশাসনগুলি থেকে কয়েকটা বিষয় পরিষ্কার হয় যে ১টি গুপ্ত সোনার মুদ্রার বিনময়ে মিলত ১৫-১৬টা রূপোর মুদ্রা - রূপক। গুপ্ত যুগের সোনার মুদ্রার ওজন ছিল ১২৪ গ্রেন; স্কন্দগুপ্তের সময় বেশ ভারি ১৪৪ গ্রেনের সোনার মুদ্রার আবির্ভাব ঘটে। এগুলির নাম হয় সুবর্ণ। পরে নরসিংহ গুপ্ত বালাদিত্যের সময় এই সুবর্ণগুলির ওজন কমানো( debased) হয়। সুবর্ণর অনুরূপ সোনার মুদ্রা পাওয়া যায় শশাঙ্কের পূর্বে ৬০০ খ্রি এবং তার সময়েও(৬০০-৩৭?খ্রি)। সমতটের শাসকের মুদ্রার অনুরূপে সপ্তদশ অষ্টাদশ শতের এই সোনার মুদ্রার পরিকল্পনা করা হয়। সুবর্ণর গুণগত মানের এই স্বর্ণমুদ্রায় সোনার পরিমান বেশ কম। এর পরে চার বা পাঁচ শত ধরে বাংলার আর্থব্যবস্থায় আর কোন সোনার মুদ্রার খোঁজ পাওয়া যায় না।

৭০০ থেকে ১২০০ সাল পর্যন্ত বাংলায় জটিল আর্থ ব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায়। একটা বিষয় লক্ষ্য করার মত যে পাল আর সেন রাজত্বে নতুন কোন মুদ্রা লক্ষ্য করা না গেলেও সপ্তম থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত সমতট-হরিকেল অঞ্চলে বিপুল পরিমানে উচ্চগুণমানের রূপোর মুদ্রার প্রচলন ছিল(যদিও কোন রাজত্বে প্রচলিত হয়েছিল তার কোন উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে না এই মুদ্রাগুলি থেকে)। দীর্ঘ দিন ধরে মুদ্রায় দামি ধাতুর গুণমান বজায় রাখার চেষ্টা থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার, এই অঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে বিপুল ক্ষমতাধর কোন শাসক রাজত্ব করেছে কর্তৃত্ব নিয়েই। এগুলি প্রখ্যাত মুদ্রা পুরাণ এবং দ্রম্মের গুণমানের ৫৭.৬ গ্রেন ওজনের। এই দুই মুদ্রার উল্লেখ আমরা কিন্তু পাল আর সেন রাজত্বের তাম্রসাসনে পাচ্ছি। দশম শতের পর থেকে হরিকেলের মুদ্রা হাল্কা হল কিন্তু তার ব্যসার্ধ বাড়ে চওড়া হল এবং তার এক দিকে ছাপা থাকত। হরিকেলের মুদ্রা ছাপার পরিবর্তনের মধ্যে সুষ্পষ্টভাবে আরব মুদ্রা ব্যবস্থার প্রভাব বর্তমান। এর থেকে বাংলার উপকূলের আরবের ব্যবসার যোগসূত্র প্রমানিত হয়। বাংলার উপকূলের সঙ্গে আরবের ব্যবসার আরও সূত্র পাওয়া যায় অষ্টম শতে হারুনঅলরশিদ, দ্বাদশ শতের মুস্তাসিম বিল্লার রাজত্বের মুদ্রা ময়নামতি এবং পাহাড়পুরে প্রত্নতত্ত্ব খননে উদ্ধার হওয়ায়। বহু গবেষক যে বলেছেন সামন্ততন্ত্রের প্রভাবে বাংলার উপকূল অঞ্চলে বহির্বাণিজ্যে ভাটার টান দ্যাখা যায়, এই সব মুদ্রা বিপুল সংখ্যায় পাওয়া যাওয়ায় সেই তত্ত্ব খারিজ হয়ে গিয়েছে। জমিদানলিপি আর মুদ্রা ব্যবস্থা পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল ছিল না হয়ত, কিন্তু কিছু অঞ্চলে তারা পাশাপাশি অবস্থা করত। পুরাণ আর দ্রম্মর মত রূপোর মুদ্রার সঙ্গে ১২৮০টি কড়ির সরল সহজ এবং সাধারণ বিনিময়যোগ্যতার উদাহরন পাচ্ছি সেই সময়ের অঙ্কের ধারাপাতে। সেন আমলে চুর্ণির ব্যবহারের উল্লেখ পাচ্ছি যা কর্পর্দক আর কড়ির মধ্যবর্তী বিনিময় মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়। এর থেকে প্রমান হয় চুর্ণি বা/অথবা কপর্দক-চুর্ণি বিনিময় মাধ্যম হিসেবেই কাজ করেছে। 

অসংগঠিত ব্যবসাই কালোটাকার আড়ত - ডান থেকে বাম সক্কলের তাই ধারণা

যদিও গাঁ থেকে মায়ের আঁচলের এক টাকাও ছিনিয়ে নিয়ে এসে বড় পুঁজির ভাঁড়ারে জমা দেয় ব্যাঙ্ক।

মোদিবাবু যে আমাদের(গ্রামের পরম্পরার উতপাদক, চাষী, সেবা দেওয়ার মানুষ) সরাসরি কালো টাকার আড়তদার ভেবেছেন - কি তিনি খুব ভুল পথে হেঁটেছেন? পশ্চিমা অর্থনীতির পড়াশোনার বইগুলিতেও তো তাই বলা হয়েছে।

৮ তারিখের খুব কাছে কাছের সময়ে প্রভাত পট্টনায়েক যে প্রবন্ধটি লিখেছেন, সেটার ওপর থেকে মার্ক্সবাদী খোলস ঝেড়ে ফেললে দেখা যাবে মোদিবাবু যা করেছেন, তাকে তিনি ঘুরিয়ে সমর্থন করেছেন - তার বড় জোর অভিযোগ মানুষকে হয়রাণ করার - বেশি কিছু নয়। মোটামুটি নোট বাতিলের পক্ষেই সওয়াল করেছেন। ডাম আর বাম এ বাবদে এক তলে দাঁড়িয়ে।

প্রশাসনের, শহরের ভদ্ররা অনেকেই ভাবেন, আমরা ছোটলোকেরা প্রত্যক্ষ কর দিই না, বাড়ির হাঁড়িতে টাকা জমিয়ে রাখি - ফলে রাষ্ট্র গড়ার পুঁজি ছোটলোকেরা সরবরাহ করে না।

তাই ভদ্ররা অভিযোগের আঙ্গুল তুলে সরকারকে প্রশ্ন করেছেন গ্রামে ব্যাঙ্ক নেই তো গরীবেরা কি ভাবে টাকা জমাবে? তাই প্রত্যেক গ্রামে ব্যাঙ্ক করে দেওয়া হোক। তারা 'নিরাপদে' টাকা রাখবে। লগে লগে তারা প্লাস্টিক কার্ডের ব্যবহার জানবে, করবে - শেষ মেশ ভদ্রদের মত শহুরে হয়ে উঠবে - ডিজিটালযোগ্য হয়ে উঠে পপ্সচিমকে স্ববা করবে।

ছোটলোক গাঁইয়ারা জানেন ব্যাঙ্ক আদতে বড় পুঁজির বড় হাতিয়ার - যেখানে মধ্যবিত্ত সন্তানেরা চাকরি করে। ভদ্রদের পৃষ্ঠপোষক কিন্তু বড় পুঁজি। রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্ক হলেও - তার কাজ গ্রামের মায়ের আঁচলের শেষ সঞ্চয়টুকু তুলে নিয়ে এসে বড় পুঁজির সিন্দুকে জমা করা।

গ্রামীন উদ্যমীরা তার ঘামে ভেজানো টাকা নিরাপদে তুলে রাখে রান্না ঘরের চালের হাঁড়িতে বা লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে। সেই টাকা স্থানীয় অর্থনীতিতে খাটানোর জন্য সে আয় করে - বিদেশে বা শহরের মধ্যবিত্তের কর্পোরেট উতপাদন/শিক্ষা কেনার জন্য ঋণ দেওয়ার বা সরাসরি কর্পোরেটদের ঋণ দেওয়ার জন্য নয়।

ফলে মোদিই হোক বা অন্য রাষ্ট্র নেতা (মমতা কিছুটা আমাদের দয়ায় চক্ষে দেখেন - তিনিও সরাসরি ডিজিটাইজেশনের পক্ষে), সক্কলের কাছে আমরা কালো টাকার ধারক-বাহক।

গাঁইয়া আর শহুরে গাঁঅয়ারা সরাসরি বধ্য, না হলে বিনা প্রশ্নে উচ্ছেদযোগ্য!

Saturday, December 9, 2017

উপনিবেশপুর্ব বাংলা - বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য৭

রণবীর চক্রবর্তী

এর আগে যে আমরা বিভিন্ন বন্দর বিষয়ে আলোচনা করেছি, তার থেকে প্রমান হয় যে ভূমিপরিবেষ্টিত গঙ্গেয় উপত্যকা এবং নদীমাতৃক বাংলার বৈদেশিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল এই বন্দরগুলির সেবা। ষোড়শ থেকে ত্রয়োদশ শতে প্রাপ্ত বিভিন্ন শিলালেখতে উল্লিখিত নৌখাত, নৌযোগ, নৌদন্ডক, নৌবন্ধক, নৌস্থিরবেগ, নৌপৃথিবীর মত নৌযোগ শব্দগুলো থেকে একটাই বিষয় প্রমান হয় গঙ্গা এবং গঙ্গার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন আন্তঃযোগাযোগ সমৃদ্ধ নদীপথে নানান ধরণের নৌযোগাযোগের একটি বিপুল বিস্তৃত ব্যবস্থা ছিল। উপকূল এলাকার বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে বাংলার বর্তুলাকার তৈজস পাওয়া যাওয়া থেকে প্রমান হয় যে বাংলার সঙ্গে এই সব এলাকার যোগাযোগ ক্রমশ বাড়ছে। পূর্ব উপকূলের নানান উৎখনন এলাকা যেমন আলাগানাকুলম, কাবেরীপট্টিনম, আরিকামেদু, ভাসাভাসামুদ্রম, কাঞ্চিপুরম(সব তামিলনাড়ু), অমরাবতি, সালিহুন্দ্রম, কিলঙ্গপট্টনম(সব অন্ধ্রপ্রদেশ) শিশুপালগড়(ওডিসা) এবং বাংলার তাম্রলিপ্তি আর চন্দ্রকেতুগড়ে দ্বিতীয় শতাব্দ থেকে ২০০ খ্রিষ্টাব্দে পাওয়া যাওয়া বর্তুলাকার পাত্রের উপস্থিতি প্রমান করে এগুলির মধ্যে আন্তঃসংযোগ।
৪১৪ সালে ফাহিয়েন তাম্রলিপ্তি থেকে চিনের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানে তিনি সওদাগরি জাহাজ চড়ে শ্রীলঙ্কা পৌঁছন, শ্রীলঙ্কা থেলে জাভা হয়ে চিনের পথে রওনা হন। এই তথ্য থেকে প্রমান হয় যে বাংলা থেকে শ্রীলঙ্কা থেকে দক্ষিণপুর্ব এশিয়ার বাণিজ্য যোগাযোগ ছিল। হিউএনসাং স্পষ্ট বলছেন যে সমতটের সঙ্গে পেগু, শ্রীক্ষেত্র, দারাবর্তী এবং যমনদ্বীপের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। এই তথ্য প্রমান হয় ৬৭৫ সালে ইতসিঙ্গএর সমতটে হাজির হওয়ায় ঘটনাটি। তিনি দক্ষিণপূর্ব এশিয়া থেকে সমুদ্র পথে বাংলায় পৌঁছান। মলয় উপদ্বীপে প্রাপ্ত ষষ্ঠ শতকের একটি শিলালিপি থেকে পাচ্ছি কর্ণসুবর্ণের আশেপাশের রক্তমৃত্তিকার অধিবাসী মহানাবিক বৌদ্ধগুপ্তের নাম। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া জমিদানের একটি শিলালেখ থেকে জানতে পাচ্ছি বাংলার সঙ্গে সরাসরি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগের সূত্রটি যেখানে দেবপালকে যবদ্বীপের রাজা বলপুত্রদেব নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কিছু জমি বরাদ্দ করার জন্য অনুরোধ করছেন। এই কৃষ্টিগত যোগাযোগের মধ্যে দিয়েই কিন্তু বিস্তৃত ব্যবসায়িক যোগের ইঙ্গিত পাই।
নবম থেকে ত্রয়োদশ শতকের আরব সূত্র থেকে পাচ্ছি, সমন্দর থেকে নিয়মিতভাবে সিলান্দীব(শ্রীলঙ্কা), কাঞ্জা(কাঞ্চীপুরম), উরানসিন(ওডিসা)এর যোগাযোগ ছিল। দ্বাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের পরের সময় থেকে মালদ্বীপের সঙ্গে সমুদ্র পথে যোগাযোগ স্থাপন হল। ইবন বতুতা এই রাস্তা ধরে বাংলায় এসেছিলেন। তিনি বাংলার উপকূল থেকে জাভা যাওয়ার পথে সোনারগাঁও থেকে চিনা সওদাগরী জাহাজ(জাঙ্ক) ধরে জাভা যান, সেখান থেকে চিনে পোঁছন। সেনাপতি চেং হোর অভিযান সম্বন্ধে মা হুয়ানের বর্ণনা থেকে অসম্ভবভাবে পরিষ্কার হয়ে যায় যে ১৪০৪ থেকে ১৪৩৩ পর্যন্ত তিনি সাত্তিগাঁও(চট্টগ্রাম)তে চারবার এসেছিলেন। বাংলার উপকূলঅঞ্চল বিশেষ করে সমতট-হরিকেল যে বিপুলভাবে সমুদ্র বাণিজ্যে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মালাক্কার উপদ্বীপের নানান দেশের এবং বঙ্গোপসাগরীয় এলাকার উপকূলভূমির সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং বাণিজ্যে বড় ভূমিকা নিয়েছিল এই তথ্যগুলি প্রমান।

উপনিবেশপুর্ব বাংলা - বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য৬

রণবীর চক্রবর্তী

বাণিজ্য পথ – আমরা আগেই জেনেছি যে বাণিজ্য বাংলার ভৌগোলিক অবস্থা, বিশ্ববাণিজ্যে তাকে নানান সুবিধার দেশ হিসেবে প্রতিপন্ন করেছিল। রাজমহল পেরিয়ে পুণ্ড্রবর্ধন মধ্যগঙ্গার উপত্যকার সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। ফলে পুণ্ড্রবর্ধন বাংলার প্রথম এলাকা তৃতীয় চতুর্থ খ্রিপূর্বশতে যেখানে সর্বপ্রথম শহরীকরণ ঘটছিল, ফলে নর্দান ব্ল্যাক পলিশড ওয়ার – কালো চকচকে তৈজস পাওয়া গিয়েছিল – এই দুটি উদাহরণ(শহরীকরণ ও কালো তৈজস) থেকে প্রমান হয় মধ্যগঙ্গা উপত্যকার সঙ্গে সমুদ্র বানিজ্যের যোগ ছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে বিভিন্ন খরোষ্টি ও ব্রাহ্মী-খরোষ্টি লিপি থেকে এই অঞ্চল যে দীর্ঘকাল ধরে বিশ্ববাণিজ্যের সংগে যুক্ত ছিল, এই তথ্য আমরা এ সম্বন্ধে বিস্তারিত তথ্য পেয়ে থাকি। খরোষ্টি সাধারণত উপমহাদেশের উত্তরপশ্চিম এলাকায় ব্যবহৃত ভাষা। ফলে আজকের পশ্চিম বাংলায় যদি খরোষ্টি পাওয়া যায়, তাহলে এই তথ্য প্রমান হয় যে এই সহস্রাব্দের প্রথম পাদে গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলার সঙ্গে উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ছিল। এটাও সাধারণত পরিষ্কার হয়ে যায় যে বাংলার বদ্বীপ অঞ্চল মধ্যগঙ্গা উপত্যকা মার্ফত এই যোগাযোগ রাখত – কারণ উত্তরপ্রদেশের বেনারসের চুনারে এবং কুমারাহরে খরোষ্টি লিপি পাওয়া গিয়েছে। শ্রীচম্পা (পূর্ববিহারের ভাগলপুর) দেশের নাম প্রথম কণিষ্কর রবতক শিলালিপিতে পাওয়া গিয়েছে। হয়ত উত্তরপশ্চিম প্রদেশ থেকে মধ্যগঙ্গা উপত্যকা হয়ে বদ্বীপবাংলার দিকে তার সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটছিল – তাই এই অঞ্চল খুঁড়ে খরোষ্টি লিপি পাওয়া গিয়েছে। এই কৃষ্টিগত আদানপ্রদান বাণিজ্যিক যোগাযোগেও বিস্তৃত হয়েছিল, মনে রাখতে হবে মধ্য এশিয়ার বাংলায় যুদ্ধ ঘোড়া এই অঞ্চল হয়েই ভারতে ঢুকত।
এর পরের শতাব্দেও গঙ্গার উপকূলভূমির সঙ্গে গঙ্গার বদ্বীপের যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠভাবে বাড়তে থাকে। মগধ থেকে তাম্রলিপ্তি পর্যন্ত ফাহিয়েনের নিরুপদ্রব যাত্রা এই তথ্য প্রমান করে। বাংলায় হিউএনসাংএর দিনলিপিও এই সূত্রকে প্রমান করে। তিনি নালন্দা থেকে যাত্রা শুরু করে রাজমহল পাহাড় হয়ে কজঙ্গলে পৌঁছান। এখান থেকে তিনি পুণ্ড্রবর্ধন হয়ে কামরূপের দিকে এগিয়ে যান। কামরূপ হয়ে তিনি ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ধরে তিনি সমতটে নেমে আসেন। সেখান থেকে তিনি তাম্রলিপ্তির দিকে রওনা হয়ে যান। তাম্রলিপ্তি থেকে উত্তরদিকে রওনা হয়ে শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণসুবর্ণে  পৌঁছন।

তার উপমহাদেশের তীর্থযাত্রা তাকে শেষাশেষি ওড্র বা ওডিসার দিকে নিয়ে যায়। আমাদের ধারণা কর্ণসুবর্ণ, আজকের রাঢের কাণসোনা থেকে তার ওড্রদেশে যাওয়ার পথ ছিল দণ্ডভুক্তি(আজকের মেদিনীপুরের দাঁতন) মার্ফত। তাঁর গতায়াতে একটা বিষয় প্রমান হয় যে বাংলার বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগের সুগম পথ ছিল। এ প্রসঙ্গে মগধ, কামরূপ আর ওড্রের সঙ্গে বাংলার স্থলপথের যোগাযোগের বিষয়টি আগামী প্রসঙ্গ আলোচনায় পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার কথা। অষ্টম শতে তিন শ্রেষ্ঠী পুত্র অযোধ্যা থেকে তাম্রলিপ্তির দিকে যাত্রা করে। তাদের এই যাত্রার বিবরণ দুধপাণি শিলালেখ থেকে মোটামুটি বিশদে পাওয়া যায়। তারা অযোধ্যা থেকে শুরু করে মধ্যগঙ্গা উপত্যকার হাজারিবাগ হয়ে আসেন। দেবপালের সময়ের ঘোষরওয়াঁ শিলালিপি থেকে আরও একটা উদাহরণ পাচ্ছি যে সীমান্তের নগরহার(আজকের জালালাবাদ) থেকে মহাবোধি পর্যন্ত এসেছিলেন বিরধরদেব। এ প্রসঙ্গে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করার যে বিরধরদেব নালন্দায় এসে তাঁর দেশের নানান মানুষকে দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন। এর থেকে কয়েকটা জিনিস পরিষ্কার হচ্ছে যে দক্ষিণ বিহারের সঙ্গে নবম শতেই উপমহাদেশের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। উত্তরাপথ থেকে বাংলায় নিয়মিত ঘোড়া ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি এই তথ্যই প্রমান করে যে এই দুই এলাকার সঙ্গে বাংলার ব্যবসায়িক লেনদেন গড়ে উঠেছিল। করমণ্ডল উপকূল হয়ে বঙ্গোপসাগরের তীর ধরে উপকূল বাংলায় যে পৌঁছান যায় তার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমান রাজেন্দ্রদেব চোলের গাঙ্গেয় লিপিতে(১০২২-২৩ খ্রি) উতকীর্ণ তন্ডভুক্তি(দণ্ডভুক্তি), তক্ষণলাধম(দক্ষিণ রাঢ), উত্তীরালাধম(উত্তররাঢ) এবং বঙ্গলদেশ(বঙ্গের দিক্ষিণ এবং উপকূলভূমি) নামগুলি থেকে। রাজেন্দ্র চোলের বাহিনী অন্ধ্র, ওডিসা উপইকূলভূমি হয়ে মেদিনীপুর জেলা ধরে বাংলায় প্রবেশ করে। সপ্তম শতে হিউএনসাংএর যাত্রায় বাংলায় সঙ্গে করমণ্ডল উপকূলের যোগাযোগের প্রমান আমরা দেখেছিলাম। পাল-সেন আমলে বহুবার উল্লিখিত গমগমিকা(গতায়াতের উপরে নজর রাখা) বা শৌলকিকা(শুল্ক আদায়ের কাজে নিযুক্ত) নামক অমাত্য(সরকারি আধিকারিক) পদগুলির বর্ণনা থেকে আমরা বুঝতে পারি সে সময়ে বাংলার বাণিজ্য প্রচেষ্টার সঙ্গে উপমহাদেশের বিভিন্ন এলাকার যোগ ছিল। 

Friday, December 8, 2017

উপনিবেশপুর্ব বাংলা - বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য৫

রণবীর চক্রবর্তী

সুন্দরবন থেকে পাওয়া শ্রীমদ্দমনপালের তাম্রশাসনে দেখতে পাই,  ১১৯৬ সালে গঙ্গার সমুদ্র মোহানায় দ্বারহটক নামে একটি স্থান ছিল। এটি একটি ছোট নদী বাজার কেন্দ্র(হট্টক) ছিল যা আদতে সমুদ্রের মুখ(আদ্বার) ছিল।  রাঢ়ের দক্ষিণে বঙ্গ-সমতটে হয়ত তাম্রলিপ্ত বা সমন্দরের থেকে কম বিখ্যাত, কিন্তু উপকূলবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে নদীমাতৃক বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্র ছিল। গঙ্গা ও ভাগীরথীর সঙ্গে নানান নদীর নাব্যতা এবং তাতে চলাচল করা নানান নৌকো জাহাজের উদাহরণ আমরা বিভিন্ন লেখায় পাচ্ছি।
বঙ্গের ভেতরে নানান এলাকায় প্রচুর হাট(হট্ট বা হট্টিকা) ছিলই যেগুলির উল্লেখ আমরা পাচ্ছি অষ্ট শতাব্দের পরে নানান ধরণের শিলালেখ বা তাম্রশাসনে। হট্ট আজকের লব্জে হাট। এগুলি সপ্তাহে একবার বা দুবার বসত। সে সময় বাংলায় যে ব্যবসা ত্রিভূজ ছিল, তার ভূমিতটের ভিত্তি ছিল হাট। তবে হট্টভর কিন্তু সাধারণ হাটের তুলনায় একটি বড় এলাকা। দেবপালদেভট্ট নালন্দার কাছের একটি হাট, এবং যেহেতু রাজার নামে এই হাটটির নাম হয়েছে, সেহেতু আন্দাজ করা যায় সাধারণ হাটের তুলনায় এর আকার অনেক বেশি ছিল।
মাঝেমধ্যে দোকানের(আপণ) নাম উল্লিখিত হয়েছে যেমন ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রশাসনে। সেন রাজত্বের শেষ দিকে যে তাম্রশাসন পাওয়া যায় তাতে চতুরক নাম পাচ্ছি, তবে তা দ্বাদশ শতের আগে নয়। আমাদের ধারনা চতুরক নাম হল চার রাস্তার সংযোগস্থল, হয়ত আন্তঃরাজ্য ব্যবসায় নিযুক্ত বিভিন্ন বিভিন্ন পাইকারের মিলনস্থল। এ ধরনের একটির নাম বেতড্ডচতুরতক যার পূর্বে গঙ্গা(পূর্বি জাহ্নবীসীমা) আজকের হাওড়ার বেতোড় হসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফলে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে বড় হট্ট বা চতুরকগুলি সে সময়ের কোন বড় ব্যবসাকেন্দ্র বা কোন বন্দরের পশ্চাদভূমির যোগাযোগ মাধ্যম ছিল। উত্তরপথে বা দাক্ষিণাত্যে এই ধরণের মাঝের ব্যবসাকেন্দ্রগুলির নাম ছিল মণ্ডপিকা বা আজকের বাজারের প্রতিশব্দ মাণ্ডি, পেঠনা আজকের পেঠ বা নগরম।
এই বাজার এবং বন্দরগুলিতে বিভিন্ন শ্রেষ্ঠীর অবস্থান ছিল, তারা এই বন্দরগুলিকেই ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে পছন্দ করতেন। চন্দ্রকেতুগড় বা অন্যান্য প্রত্নস্থলে বিভিন্ন পোড়ামাটির সিলে ধানের শিসের ছাপ পাওয়া গিয়েছে, অর্থাৎ এই অঞ্চলের ব্যাপারীরা ধান নিয়ে ব্যবসা করত। সংস্কৃত শব্দ বণিক বা বৈদেহক শব্দে সাধারণত সব ধরণের পণ্য নিয়ে ব্যবসা করা ব্যবসায়ী বোঝাত। বহু জাতকের গল্পে সার্থবাহ(বণিকদের নেতা) বণিকদের দূর দেশে যাত্রা করার  গল্প বর্ণিত আছে (পুব্বন্তঅপরান্ত) যেমন পুষ্কলাবতী থেকে(পাকিস্তানের চারসাদ্দা) তাম্রলিপ্তিতে আসা।  ৪৪৪-৫৪৪ সালে প্রাপ্ত পাঁচটি দামোদরপুর তাম্রশাসনে বলা হয়েছে কোটিবর্ষের সার্থবাহ বণিক এবং নগরশ্রেষ্ঠীদের কথা। নগরশ্রেষ্ঠী অর্থে ধনী ব্যবসায়ী। প্রাচীন সাহিত্যে তাদের অত্যন্ত ধনী এবং বিনিয়োগকারী রূপে বর্ণিত করা হয়েছে, যারা তাদের বিপুল অর্জিত অর্থ বিভিন্ন ব্যবসায়িক কাজে বিনিয়োজিত করেন। এটাও বলা দরকার সার্থবাহ এবং নগরশ্রেষ্ঠী কিন্তু অন্তত এক শতাব্দ স্থানীয় জেলা প্রশাসনের(বিষয়ধিষ্ঠানঅধিকরণ) দপ্তরের অংশ ছিলেন, যদিও তারা কোনভাবেই স্থানীয় প্রশাসক ছিলেন না। একটা বিষয় পরিষ্কার যে সার্থবাহ আর নগরশ্রেষ্ঠী দু ধরণের পেশাজীবি তাদের সমাজের প্রতিনিধি ছিলেন এবং সামগ্রিক সমাজে বিপুল সম্মান লাভ করতেন। খুব বেশি লেখতেই ব্যক্তিগত ব্যপারীদের নাম উল্লিখিত হয় নি, শুধু একবার জনৈক ভদ্রসার্থ, জম্ভলমিত্র দশম শতের শেষ পাদে সমতটে গণেশ দান করার উল্লেখ ছাড়া।
ভদ্রসার্থ শব্দটা হয়ত এসেছে পুরনো ক্যারাভান ব্যবসায়ীদের নাম থেকে। অথবা প্রাচীন তামিল লেখতে উল্লিখিত ভদ্দুয়াবাহারি বা প্রবীন ক্যারাভান ব্যবসায়ী হিসেবে। অষ্টদশ থেকে ১৩০০ সাল পর্যন্ত, বিভিন্ন সাহিত্যে ব্যসায়ীদের উল্লেখ কমে যাওয়ায় বহু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই সময় বাংলার ব্যবসায়ে ভাটার টান এসেছিল। বাংলায় সামন্ততন্ত্রের শেকড় গাড়ার ফলে ব্যবসার অবনতি ঘটা, এই তত্ত্ব বহু ঐতিহাসিক খারিজ করেছেন নানান সূত্রে।

Thursday, December 7, 2017

উপনিবেশপুর্ব বাংলা - বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য৪

রণবীর চক্রবর্তী

বাজার আর ব্যবসায়ী - আমাদের হাতে যে সব তথ্য আছে তাতে পরিষ্কার যে এ জন্য বাংলায় নির্দিষ্ট বাজারে এসে ব্যবসায়িরা পণ্য হাত বদল করতেন। বাংলা জুড়ে নানান ধরণের বিশেষ বিশেষ বাজার ছিল এবং এই বাজারে বিশেষ ধরণের ব্যাপারীরাও ছিল।
বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ন ব্যবসায়িক কেন্দ্রগুলি ছিল পুণ্ড্রনগর, কোটিবর্ষ, মঙ্গলকোট, কর্ণসুবর্ণ, রামাবতী, বিক্রমপুরা। এগুলি সে সময়ের রাজনৈতিক প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল, একই সঙ্গে ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবেও কাজ করত। অতীত বাংলায় এই এলাকাগুলি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাকেন্দ্রগুলির মধ্যে প্রথমসারির ছিল। এই শহরগুলোর সঙ্গে বন্দর, সে সময়ের নাম ছিল পত্তন বা ভেলাকুলের যোগ থাকত। প্রথম সহস্রাব্দের আগের শতক থেকে অষ্টম শতক পর্যন্ত তাম্রলিপ্তি ছিল পূর্বাঞ্চলের জমিবদ্ধ গঙ্গা উপত্যকার সব থেকে বড় বন্দর। রূপনারায়ণের ওপরের এবং ধারণা করা হয় বর্তমান তমলুক শহরে এই বন্দরের অবস্থান। তাম্রলিপ্তর পুরনো নাম ভেলাকুল। প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে কিন্তু সাহত্যিক দাবির প্রমান মেলে নি, যা আমরা বিভিন্ন লেখমালা বা সাহিত্যিক সূত্রে জানছি। টলেমি একে তামোলিতি নাম দিয়েছেন আর প্লিনি বলেছেন তালুক্তে। হিউএনসাঙ্গের বর্ণনায় তান-মো-লি-তি সে সময়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থলে ছিল, বিশেষ করে বঙ্গোপ্সাগরের সামুদ্রিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হিউএনসাঙ্গ(৬৩৯-৪৫ খ্রি) ছাড়াও তাঁর আগে ফা হিয়েন (৩৯৯-৪১৪ ক্রি) এই বন্দর দিয়েই গতায়াত করেছেন।
পেরিপ্লাস এবং টলেমির ভুগোলে(১৫০ খ্রি) গঙ্গে নামক একটি বন্দরের অবস্থান দেখানো হচ্ছে যেটি গঙ্গা আর সমুদ্রের মোহানায় অবস্থিত। আজও পর্যন্ত এই বন্দরটি যে চন্দ্রকেতুগড়ের বন্দর এমন কোন লিখিত প্রামান্য তথ্য পাওয়া যায় নি। বিদ্যাধরী নদীর তীরে অবস্থিত চন্দ্রকেতুগড় প্রথম সহস্রাব্দের প্রথম তিন শতক তার পূর্ণ উজ্জ্বলতায় টিকে ছিল। সেখানের উৎখনন থেকে আবিষ্কৃত ত্রাপক্য ধরণের উপকূল ধরে ধরে চলার জাহাজ এবং সমুদ্রগামী জাহাজ, জলাধিশক্র(সমুদ্রের ইন্দ্র) বিদেশ যাত্রার(ত্রিদেশযাত্রা) অনুকূল ছিল বলে মত প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাম্রলিপ্তি প্রাচীন বাংলার সব থেকে গুরুত্বতম এবং উজ্জ্বলতম বন্দর, চন্দ্রকেতুগড়/গঙ্গে তার থেকে বেশ ছোট ছিল এবং তাম্রলিপ্তিকে তার পশ্চাদভূমির পণ্যসামগ্রী পাঠানোর কাজে ব্যবহৃত হত।
তবে সাহিত্যক সূত্রে তাম্রলিপ্তির অবস্থান আমরা অষ্টম শতের পরে আর পাচ্ছি না। রূপনারায়ণে পলি জমতে থাকায় বন্দরটি আস্তে আস্তে তার বৈদেশিক বন্দরের চরিত্র হারাতে হারাতে মৃত হতে থাকে। বিপুল বিশাল বন্দরের মৃত্যু পূর্ব ভারতের অর্থনীতির ওপর তীব্র আঘাত আসে। কিন্তু আজকের বাংলাদেশের দক্ষিণপূর্ব অঞ্চলের সমতট-হরিকেল অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বৈদেশিক বাণিজ্যকে ধরে রাখে, যার বিবরণ আমরা পাই সপ্তম শতে ফা হিয়েনের লেখা থেকে।
এছাড়াও আরব(অনেকের মধ্যে সুলেইমান, ইবন খোরদাদবেদ, অল মাসুদি, অল ইদ্রিস, অল মারভাজি এবং ইবন বতুতা মুখ্যত), পারসিক(আদুদ অল আলম) এবং চৈনিক (চাউজুকুয়া এবং চেং হোর অভিযান) বর্ণনায় সমন্দর, সুদকাওয়ান, বা সাত্তিগাঁও আজকের চট্টগ্রামবন্দরের কাছাকাছি কোথাও অবস্থিত ছিল। তাম্রলিপ্তির ধ্বংস কিছুটা পুষিয়ে দিয়েছিল এই বন্দরের উল্কাসম উত্থান। এবং ষষ্ঠ শতে পর্তুগিজেরা এই বন্দরের নাম দেয় পোর্ট গ্রাণ্ডে।  

তাম্রলিপ্তর মতই সমুন্দরের অনেকগুলি নদী পরিবহন ভিত্তিক পণ্য সরবরাহ বন্দর ছি্ল। এগুলির মধ্যে দুটি প্রধানতম দেবপর্বত এবং বঙ্গসাগরসম্বন্ধ্রিয়ক(Vangasagarasambhandariyaka)। দেবপর্বত ময়নামতিতে অবস্থিত ছিল, সপ্তম থেকে দশম শতের কিছু শিলালিপিতে বলা হয়েছে সে সময় এই শহর ঘিরে ছিল ক্ষিরোদা নদী। সেই নদীতে নৌকো আর সর্বতোভদ্র(সব দিক দিয়ে নৌকোয় প্রবেশ করা যায় একন একটি জলযান?) ভিড় করে থাকত। নদী বন্দর ছাড়াও এটি সে সময়ের জয়স্কন্ধাবারও ছিল – আদতে সমতটের দেব শাসকদের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রও ছিল। এর নাম বঙ্গসাগরসম্বন্ধ্রিয়ক। ৯৭১ সালের চন্দ্র বংশের শিলালেখ সূত্রে সাভারে এই নদী বন্দরের অবস্থিতির উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। এই বন্দরটির নামটির কারণ এই বন্দরে সম্বন্ধর বা গুদামের ব্যবস্থা ছিল, এবং বঙ্গোপসাগরে(বঙ্গসাগর) এটির যোগসূত্র ছিল। অনেকের ধারনা সাভার নামটি সম্বন্ধর শব্দজাত। 

উপনিবেশপুর্ব বাংলা - বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য৩

রণবীর চক্রবর্তী

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীর ব্যবসা সাম্প্রতিক দশকগুলির গবেষণায় উঠে এসেছে, সেটি ছিল যুদ্ধ ঘোড়া। বাংলা কেন ভারতের কোন অঞ্চলেই ভাল যুদ্ধ ঘোড়া তৈরি হত না – সেগুলি আসত মূলত মধ্যএশিয়ার দেশ সমূহ থেকে। তারা প্রথমে আসত উত্তরপশ্চিম সীমান্ত হয়ে উত্তর ভারতে। তৃতীয় শতের কাং তাইএর লেখা সূত্রধরে জানছি য়ুয়ে-চি(কুষাণ) ব্যবসায়ীরা কোয়িং দেশে ঘোড়া নিয়ে যেত। কোয়িং দেশ মালয় উপদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সাঞ্জেন দ্বীপে পাওয়া যাওয়া একটি তাম্র পত্রে একজন য়ুয়ে-চি ব্যবসায়ীর একটি চিত্র অঙ্কন করা আছে যিনি একটি ঘোড়ার পাশে দাঁড়িয়ে। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলা দরকার উত্তর ভারতের সঙ্গে মালয় উপদ্বীপের যোগাযোগ বাংলার উপকূলীয় অঞ্চল মাধ্যমে হত। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে চন্দ্রকেতুগড়ে প্রাপ্ত তৃতীয় শতের একটি পোড়ামাটির সিলে মিশ্র ব্রাহ্মী-খরোষ্ঠী লিপিতে লেখা একটি ঘোড়ার সঙ্গে একটি পাল বিশেষ্ট জাহাজের ছাপা ছবি। এর সঙ্গে লেখাটির পাঠোদ্ধার করে বোঝা গিয়েছে জাহাজটির নাম ত্রাপ্যক, যে নামের সঙ্গে মিল আছে পেরিপ্লাসে উল্লিখিত ত্রাপাগগা বা জৈন পুঁথি অঙ্গবিজ্জয় লিখত ত্র্যাপ্যগ্যর সঙ্গে। এই সিলটি আদতে বাংলার উপকূল থেকে জাহাজে ঘোড়া নিয়ে যাওয়ার আপাতত আদিতম নিদর্শন। তামিক সঙ্গম সাহিত্য থেকে জানতে পারি, উত্তরভারত থেকে তামিলনাড়ুর উপকূলে ঘোড়া পৌঁছত। এর থেকে বাংলা যোগ স্বাভাবিকভাবেইও প্রমান হয়।
এই উদাহরণ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে তৃতীয় শতকের আগে থেকেই বাংলার উপকূলীয় বাণিজ্য মালয় উপদ্বীপ এবং তামিলনাড়ুতে ঘোড়া ব্যবসায় যুক্ত ছিল। ক্রমশ বাংলায় যুদ্ধ ঘোড়া চাহিদা বাড়তে থাকে পাল এবং সেন আমল(১৫০-১২০৫খ্রি) এই অঞ্চলের গুরুত্বপুর্ণ শক্তি হয়ে ওঠায়। এই সময়ে ঘোড়া প্রসঙ্গ আমরা পাচ্ছি পাল রাজত্বকে বিপুল সঙ্খ্যক ঘোড়সওয়ার বাহিনী উপহার দিচ্ছেন উত্তরভারতের করদ রাজারা। যদিও এটা বাঁধাগতের এবং প্রশংসাবাদপূর্ণ দাবি হয়ে যাবে, তবুও এই কথাটা না বলে পারছি না, উদিচ্য বা উত্তরাপথ বাংলার রাজাদের মূল ঘোড়া সরবরাহ অঞ্চল ছিল। ৮৪৮ সালের একটি শিলালেখতে আজকের হরিয়ানায় প্রথুদক(পেহোরা)এ ঘোড়া মেলার(ঘোটকযাত্রা) উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে।
ত্রয়োদশ শতকে তবাকতিনাসিরিতে মিনহাজুদ্দিন সমস্ত ঘোমটা সরিয়ে বলছেন তৎকালীন নুদ্দায়(আজকের নবদ্বীপে) সেন আমলে আরব অঞ্চল থেকে ঘোড়া আসত। এবং বাংলায় আরবিঘোড়ার ব্যবসায়ীদের গতায়াত এতই ঘনঘন এবং সাধারণ ব্যাপারছিল, যখন বখতিয়ার খলজির ঘোড়সওয়ারেরা নদিয়ায় পৌঁছলেন, তখন জনসাধারণ তাদের ঘোড়া ব্যবসায়ীই ভেবেছিলেন প্রথমে। রাঢ অঞ্চলের এই ঘোড়া ব্যবসা ছাড়াও লক্ষ্মণ সেনের রাজধানী লক্ষ্মণাবতী বা লক্ষ্মৌতিতেও বিপুল পরিমান ঘোরা আসত দক্ষিণ তিব্বতের উত্তরাংশ, পশ্চিম ভূটানের কারামবাটান বা কারামপত্তন বা কেরা গোম্পা থেকে। ফলে বাংলাতে ঘোড়া আসত উত্তরপূর্ব আর উত্তরপশ্চিম উভয় দিক থেকে। পঞ্চদশ শতকের চিনা পঞ্জিকা সূত্র পাওয়া যাচ্ছে মিং শাসনকালে বাংলার উপকূল থেকে চিন সাম্রাজ্যে ঘোড়া সরবরাহ হত। বাংলার দুই পাশের দুই অঞ্চল থেকে নিয়ে আসা ঘোড়া চিনের দিকে নিয়ে যাওয়া হত।
আরেকটি বিপুল পরিমানে আমদানি করা পণ্য ছিল কড়ি – বিশেষ করে ৭৫০-১৩০০ সাল সময়ে। বাংলায় খুচরোর বাজারে বিনিময় হিসেবে কাজ করত। কড়ির উৎপাদনের সঙ্গে বাংলার বিন্দুমাত্রও সম্পর্ক নেই। ইবন বতুতা আর মাহুয়ানের সূত্রে জানতে পারছি সেগুলি দূর সমুদ্রাঞ্চল – ভারত মহাসাগর থেকে আমদানি করা হত। কড়ি আনা হত জাহাজের ওজন বাড়াবার জন্যে, ঠিক যেভাবে আগামী দিনে ইওরোপে বাংলার সোরা যাবে। কড়ি ছাড়াও বাংলায় আরাকান আর পেগু থেকে আসত দামি ধাতু রূপো। সঙ্গে টিনও – যদিও এটা দামি ধাতু ছিল না কিন্তু সঙ্কর ধাতু তৈরিতে কার্যকর ও অত্যাবশ্যক ছিল।

বাংলার বাণিজ্যে, বাংলার নিজস্ব এবং বাংলার বাইরের অঞ্চলের নানান বৈচিত্রময় ধরণের পণ্যের উপস্থিতি, সে সময়ের বাণিজ্য বিশ্বে বাংলার স্থানিক গুরুত্বের প্রমান। নুনের মত খুব তুচ্ছ দৈনন্দিন পণ্য থেকে সাধারণ চাল থেকে বাণিজ্যিক শস্য থেকে সাধারণ তাঁতের কাপড় থেকে দামি মসলিন থেকে শুরু করে বিশ্বজোড়া ধণিক আর ক্ষমতাবানদের জন্য তৈরি এক্কেবারে দামিতম মহার্ঘ্য পণ্যের উপস্থিতি এক সময় বাংলাকে বাণিজ্য বিশ্বে একটি অনন্য মর্যাদা দিয়েছিল। 

উপনিবেশপুর্ব বাংলা - বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য২

রণবীর চক্রবর্তী

সাম্প্রতিককালের দক্ষিণ ২৪ পরগণা এবং মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকেতুগড় এবং তাম্রলিপ্তির প্রত্নতাত্ত্বিক উতখননে এ বাদদে অনেক তথ্য পাচ্ছি। এই অঞ্চলে প্রাপ্ত পোড়ামাটির শিলালিপি এবং সিলগুলিতে খরোষ্ঠি এবং খরোষ্ঠী-ব্রাহ্মির মিশ্র লিপির যে কার্বন-তারিখ পাওয়া গিয়েছে, তার সময় নির্ণিত হয়েছে প্রথম খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে চতুর্থ শতক পর্যন্ত। বিভিন্ন সিলে পাওয়া গিয়েছে মাস্তুল তোলা জাহাজ, ধান্যশীর্ষে আর ফসল শীর্ষনালিকার নানান ছাপ, বিভিন্ন শস্য ছাপওয়ালা শস্য বহনের পাত্রের(শস্যাধার)ও ছাপ পাওয়া গিয়েছে। ব্যবসায়ীরা খাদ্য(হয়ত ধান/চাল) ব্যবসা করে ধনী হয়েছেন তার উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। এই সময়ের বাংলা যে বিপুল শস্য উৎপাদন আর আন্তঃরাজ্য এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে রপ্তানি করত, এগুলি তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ। অনেক পরে চতুর্দশ শতকের ইবন বতুতা এবং পঞ্চদশ শতকে মাহুয়ানের লেখাতেও বাংলার ধান মালদ্বীপে রপ্তানির বিনিময়ে কড়ি ব্যবসার উল্লেখ পাচ্ছি।
এই গুরুত্বপূর্ণ শস্যের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ, পুণ্ড্রবর্ধনে আখ(ইক্ষু) চাষের উদাহরণ পাচ্ছি, সেই আখের প্রজাতির নাম কিন্তু এলাকার নামে - পুণ্ডু আখ। এটাও আমরা প্রাসঙ্গিকভাবে ভেবে নিতে পারি, চালের মতই বাংলার আখের পণ্যের বিপুল চাহিদা বাংলার বাইরে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে ছিল, যেটা আদতে বাংলার লালা ও সাদা চিনি(এবং গুড় – এটা লেখক বলেন নি – গৌড়=গুড় এটাও মনে রাখা দরকার)।
দক্ষিণের গাঙ্গে বা গঙ্গে দেশ বা গাঙ্গেয় বদ্বীপের নিম্নাংশের উল্লেখ পাচ্ছি প্রথম শতাব্দের দ্বিতীয় অংশে লিখিত পেরিপ্লাস অব ইরাথ্রিয়ান সি নামক গ্রন্থে। এই বইতে আমরা বাংলার বৈদেশিক বাণিজ্য শৃঙ্খলে বেশ কিছু পণ্যের অমেয় উল্লেখ পাচ্ছি যেমন মালাবাথরুম(সং> তামলপত্র, বাং>তেজপাতা), নার্দ(সং>নালদ, নারদ হয়ত Nardostachys grandiflora) এক ধরণের বিশেষ গন্ধ তেল। পেরিপ্লাস বলছে এই ধনীভোগ্য পণ্যগুলির বিপুল চাহিদা ছিল রোমের অভিজাতদের জীবনধারণে। একই ধরণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে দ্বিতীয় শতকে লিখিত একটি ঋণ-চুক্তি বিষয়ের ভুর্জপত্রে। এই সূত্র আমাদের জানাচ্ছে গাঙ্গেয় নার্দ বিপুল পরিমানে মালাবার উপকূলের মাজুরিস বন্দরে(আজকের কেরলের ক্রাঙ্গানোরের কাছে) হার্মোপোলন নামক জাহাজে ভর্তি করে সেটি আলেকজান্দ্রিয়ায় রওনা হয়ে যাবে। যদিও পেরিপ্লাস বলছে তেজপাতা আর নার্দ বাংলার পণ্য, আদতে এগুলি মূলত উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলো থেকে চাষ এবং প্রক্রিয়া জত হয়ে বাংলার উপকূলে রপ্তানির জন্য আসত। এই ধনীভোগ্য পণ্য উপকূল সমুদ্রপথ দিয়ে রপ্তানির জন্য মালাবারে পাঠানো হত। সেখান থেকে চলে যেত ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায়। ফলে আমরা বলতে পারি যে সব ট্রানজিট দ্রব্য বাংলার মধ্যে দিয়ে পুণঃরপ্তানি হত সেগুলির মধ্যে এই দুটি অন্যতম।
ঠিক একই গঙ্গে অঞ্চলের উৎপন্ন দামি ও সূক্ষ্ম মসলিনের উল্লেখ আমরা পেরিপ্লাসে বিপুলভাবে পাচ্ছি। এই পণ্যটি বাংলার উপকূল দিয়ে বিপুল সংখ্যায় বিদেশে যেত। এছাড়াও চিনা রেশমের লাছা, সুতো এবং চিনাংশুক গঙ্গে এলাকা হয়ে দ্রাবিড় অঞ্চলে যেত। চৈনিক রেশম স্থানীয় উৎপাদন মসলিনের মতই অত্যন্ত দামি পণ্য এবং ধনীভোগ্য এবং এটাও বাংলার অন্যতম ট্রানজিট পণ্য হিসেবে গণ্য হত। কিন্তু বাংলার তাঁতের সুখ্যাতি আমরা পাচ্ছি তৃতীয় খ্রিষ্টপূর্বে লিখত অর্থশাস্ত্রে। (তার আগে সে রকম উল্লেখ পাচ্ছি না) কিন্তু তারপর থেকে বিভিন্ন সূত্রে আমরা দেখছি বাংলার তাঁতিদের সুখ্যাতির নানান বর্ণনা নবম থেকে চতুর্দশ শতকে লিখিত আরবি আর পার্সি, চিনা লেখক, মার্কোপোলোর(ত্রয়োদশ শতে) মত লেখকদের নানান উল্লেখে। সক্কলে যদিও বাংলায় আসেন নি, কিন্তু বাংলার তাঁতের সুখ্যাতি তারা তাঁতের উৎপাদন, তার ব্যবসার সঙ্গে জুড়ে থাকা মানুষজনের থেকে সংগ্রহ করেছেন। ১২২৫ সালে চিনা আধিকারিক, চাউ জু কুয়া, পোং-কিয়েলো আর্থাত বাংলার(ভাঙ্গালা) সুতির(তৌলো) সূক্ষ্মবস্ত্রের সুখ্যাত করেছেন।
অষ্টম শতকের পর থেকে বাংলায় সুপারি(গুবাক) এবং পানের(বরজিক শব্দ পাচ্ছি পানের উৎপাদক, বিক্রেতা সূত্রে) উল্লেখ পাচ্ছি। এই সময়েই বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় পাওয়া শিলা/তাম্রলেখতে নারকেল গাছের উল্লেখ পাচ্ছি – এটারও হয়ত ব্যবসা হত। নবম এবং ত্রয়োদশ শতের তাম্রশাসনে খাদ্যে গুরুত্বপূর্ণতম উপাদান নুনের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে, বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায়।
নবম থেকে ত্রয়োদশ শতকের আরব সূত্র থেকে জানতে পারি বাংলা। বিশ্ববাণিজ্যে অসাধারন কাঠের সূত্র ছিল। আরব লেখকদের লেখায় উল্লিখিত সমন্দর বা সুদকাওয়ান(আজকের চট্টগ্রামের কাছাকাছি) অঞ্চলে কামারুণি নামক কাঠের উল্লেখ করেছেন, যা মুলতানি কাঠের পরেই বাণিজ্য ক্ষেত্রে গণ্য এবং দামি হয়। এটি কামারুণ বা কামারুন এলাকার বনজ উৎপাদন। এই কাঠ অসমের জঙ্গল থেকে মেঘনা নদীতে ভাসিয়ে আনা হত। আরবি আর পারসি সূত্রে গণ্ডারের শিং উক্ত বন্দর থেকে রপ্তানির উল্লেখ পাচ্ছি। এটি আরেকটি বিলাস দ্রব্য। এবং সেটি অসম সূত্রেই চট্টগ্রামের বন্দরে আসত।