Thursday, February 15, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২ - সিরাজ চরিত্র যাঁদের লেখা দিয়ে বিচার হয় - সুশীল চৌধুরীর বয়ানে

এবারে ইওরোপিয় নির্মান
১৭৬৩ সালে ফরাসি প্রধান কুঠিয়াল জাঁ ল, স্মৃতিকথায় সিরাজের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। ইংরেজদের বাংলা দখলের কূটনীতি মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে তিনি, নিজের এবং দেশিয় ব্যর্থতা ঢাকতে তিনি পলাশী কাণ্ডের সমস্ত দায় সিরাজের ওপর চাপিয়েছেন। ইংরেজদের কলকাতা থেকে সিরাজ তাড়িয়ে যখন সিরাজ মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন, তিনি ব্যাঙ্গাত্মকভাবে লেখেন, স্বৈরাচারী(নবাব) এখন (যুদ্ধে) জয়ী হয়ে ফিরে এসেছে। সিরাজকে তিনি অদক্ষ মাথা গরম এবং রাজ্য শাসনের ক্ষমতাহীন বলেছেন। তিনি যে সিরাজের বিরোধী এটা স্পষ্ট হয়ে যায় তার এই মন্তব্যে, সিরাজকে পদচ্যুত করার জন্যে (পূর্ণিয়াতে) একটা ষড়যন্ত্র হয়েছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে রামনারায়ণ যোগ না দেওয়ায় তা সফল হতে পারে নি। তার লেখার ভঙ্গীতেই পক্ষপাতিত্ব পরিষ্কার হয়ে যায়। সিরাজ ইওরোপিয়দের চরম ঘৃণা করতেন এই তথ্য ভিত্তিহীন। সিরাজ চন্দননগরের ফরাসি কুঠিয়াল রেনঁকে লেখেন আহমদ শাহ আবদালির আগ্রগমন আটকানোর জন্যে তিনি ইংরেজদের সঙ্গে আলিনগর(কলকাতা, ফেব্রুয়ারি, ১৭৫৭) সন্ধি করতে বাধ্য হন। ল' একে সিরাজের কাপুরুষতা ঢাকার প্রয়াস বলে মন্তব্য করেছেন। সিরাজ বিরোধী দরবারি চক্রান্তে মোহনলালকে পাশে টানতে না পারায় তিনি তাকে পাজি বদমায়েস উপাধিতে ভূষিত করেন। আর মির্জাফর সম্বন্ধে তাঁর মূল্যায়ন - সাহসী ও সৎ ব্যক্তি, এটি সর্বৈব ভুলে ভরা এবং ফারসি ঐতিহাসিকদের বিবরণে সম্পূর্ণ উলটো বর্ণনা পাচ্ছি।

একইভাবে ইংরেজ কুঠিয়াল লুক স্ক্রাফটন তার দেশিয় স্বার্থে সিরাজের কলকাতা আক্রমণকে নিন্দা করেছেন। স্ক্রাফটন নিজে পলাশী চক্রান্তের অন্যতম ষড়ী। তার উদ্দেশ্যই ছিল নবাবকে ভিলেন প্রতিপন্ন করা।

আজ আমরা সিরাজের মূল্যায়ন যে কটি লেখা ভিত্তি করে করি, সেগুলি বেশ ভুলে ভরা এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত।

সিরাজ সিংহাসনে বসার আগে এক ধরণের চরিত্রের, সিংহাসনে বসে অন্য মানুষ, এই তথ্যটা মাথায় রাখলেই আমরা পলাশীর কারণের দিকে নির্মোহ দৃষ্টিতে এগোতে পারি।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২ সিরাজ চরিত্র যাঁদের লেখা দিয়ে বিচার হয় - সুশীল চৌধুরীর বয়ানে

গোলাম হোসেন সালিম এবং করম আলি
গোলাম হোসেন সালিমের রিয়াজউসসালাতিন প্রকাশ পায় ১৭৮৬তে. তাঁর ইংরেজ মনিব জর্জ উডনির নির্দেশে. উডনি 'এই অধম ব্যক্তিকে' ওই গ্রন্থ রচনা করতে নির্দেশ দেন। আরেক গোলাম হোসেনের মতই তিনি ইংরেজ অনুরক্ত ছিলেন, এবং এ জন্য সিরাজ তাঁকেও রাজ্য থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। ইংরেজদের প্রতি তাঁর চাটুকারিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন তিনি লেখেন, 'তারা(ইংরেজরা) কোনও প্রতিশ্রুতি দিলে তা রক্ষা করতে এমনই বদ্ধ পরিকর হয় যে নিজেদের প্রাণসংশয় করেও তাতে অবিচল থাকে। মিথ্যাবাদীকে তারা সমাজে বরদাস্ত করে না। তারা উদার, বিশ্বস্ত, সহনশীল ও সম্মানিত ব্যক্তি। প্রতারণা কাকে বলে তারা জানে না। শঠতা ব্যাপারতাই তাদের কাছে অজানা।' এই মানুষটা সিরাজ সম্বন্ধে বলেছেন তিনি বদমেজাজি এবং রূঢ়ভাষী ছিলেন। সব অভিজাত ব্যক্তি ও সেনাপতিদের ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতেন।
করম আলির মুজফফরনামা ১৭৭২ সালে লেখা এবং তথ্যের ঠিক ঠিকানা নেই। তিনিও ইংরেজদের অনুকূলে সমান পক্ষপাতদুষ্ট। ঘোড়াঘাটার ফৌজদার ছিলেন কিন্তু তিনি সেখানে না থেকে প্রায়ই পূর্ণিয়াতে কাটাতেন। শওকত জঙ্গের পতনের পরে ঘোড়াঘাটার চাকরিচ্যুত হন এবং কারারুদ্ধ হন। সিরাজ তাঁকেও প্রাণে না মেরে পাটনায় নির্বাসিত করেন।
ফরাসীদের বিরোধিতা এবং ইংরেজদের চাটুকারিতার প্রমান হয় যখন তিনি বলেন, আল্লার ইচ্ছা, ফরাসিরা(ইংরেজদের দ্বারা) বাংলা থেকে বিতাড়িত হোক।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১ - সিরাজ চরিত্র যাঁদের লেখা দিয়ে বিচার হয় - সুশীল চৌধুরীর বয়ানে

'সিরাজদ্দৌল্লা সত্যি সত্যিই ভিলেন জাতীয় নিকৃষ্ট জীব ছিলেন কি না তা বিচার করার আগে যাঁরা তাঁর সম্বন্ধে এ অভিযোগ করেছেন তাঁদের সম্যক পরিচয় জানার একান্ত প্রয়োজন।এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার বেশিরভাগ ফারসি ইতিহাসই পলাশীর প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ বছর পরে লেখা, যখন ঐ ঘটনাবলী সম্বন্ধে উক্ত লেখকদের স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গিয়েছে।তাছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল যে ফারসি ইতিহাসগুলির বেশিরভাগই লেখা হয়েছিল ওইসব লেখকদের ইংরেজ প্রভু বা মনিবদের আদেশে বা তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায়। তাই এগুলিকে সে যুগের ঐতিহাসিক তথ্যের প্রকৃত সূত্র হিসেবে গণ্য করা যায় কি না তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ থেকে যায়। সিরাজদ্দৌল্লাকে 'ভিলেন' বা দুর্বৃত্ত প্রমান করা গেলে ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের যথার্থ্য প্রমান করা সহজ হয় অর্থাৎ সেক্ষেত্রে বলা যায়যে ইংরেজরা বাংলা জয় করে এক স্বেচ্ছাচারীর হাত থেকে বাংলাকে রক্ষা করেছে। এতে ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের একটা যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা মিলবে। ফলে পলাশী ষড়যন্ত্রের চক্তান্ত করা সত্ত্বেও ইংরেজদের ভূমিকা ততটা নিন্দনীয় হবে না।' সুশীল চৌধুরী, পলাশীর অজানা কাহিনী
সিরাজের বিষয় নিয়ে আমরা এর আগে একটা লেখা দিয়েছিলাম। সেটাও সুশীলবাবুর বয়ানে। সিরাজের চরিত্র সেখানে তিনি বিশ্লেষণ করে বলেছিলেন, নবাব হওয়ার আগে এবং পরে সিরাজ দুটি ভিন্ন মানুষ। অথচ সিরাজের ভিলেনি সম্বন্ধে প্রায় সমসাময়িক ঐতিহাসিক ও পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ঐক্যমত্য দ্যাখা যায়। সিয়ারেমুতক্ষরিণএর লেখক গোলাম হোসেন খান সব থেকে বেশি সোচার। তাঁর সম্বন্ধে প্রচুর কটুক্তি করেছেন। রিয়াজেও গোলাম হোসেন সেলিমও কড়া সমালোচনা করেছেন। বিপুল সমালোচনা করেছেন ফরাসি কুঠের প্রধান জাঁ ল, ইংরেজ কুঠিয়াল লুক স্ক্রাফটনও।নীচে এদের নিয়ে আলাদা আলাদা করে আলোচনা করব।
এই কিস্তিতে গোলাম হোসেন খান।
১) সিররেমুতক্ষরিণের প্রণেতা গোলাম হোসেন খান।
সেযুগের নামি ঐতিহাসিক এবং সিরাজের কট্টর সমালোচক। আলিবর্দির বাড়ির হাজি বা বাড়ির সরকার। প্রথম থেকেই গোঁড়া ইংরেজ ভক্ত এবং সিরাজ বিরোধী। করম আলির ভাষায় ইংরেজদের বন্ধু হিসেবে তাদের ওকালতি করায় তাঁর চাকরি খুইয়েছিলেন এবং সিরাজ তাঁকে প্রাণে না মেরে বাংলা থেকে বহিষ্কার করেন। এই গোলাম হোসেন খানই শওকত জঙ্গকে প্ররোচিত করেছিলেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে জোট বেঁধে এ-ব্যাপারে(পলাশী) অগ্রসর হতে কারণ শোনা যাচ্ছে যে ইংরেজরা সিরাজের বিরুদ্ধে অভিযান করতে চায়।পরে মীর কাশেমের প্রিয়পাত্র হিসেবে প্রচুর ধনসম্পত্তির মালিক এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন।
সিরাজ ইংরেজদের সঙ্গে পায়ে পা লাগিয়ে বিবাদ করছে এই তত্ত্বটা গোলাম হোসেন খানএর তৈরি। ইংরেজদের প্রতি তাঁর পক্ষপাতিত্ব এবং চাটুকারিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন তিনি লেখেন - 'এই জাতির(ইংরেজ)... শক্তি, সাহস ও মনোবলের কোনও তুলনা হয় না', বা 'এই জাতির সেনাপতিরা অত্যন্ত দক্ষ, সতর্ক ও সব ব্যাপারে অভিজ্ঞ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে এরা অসম সাহসী।' তিনি আরও লেখেন, 'এই জাতি কোনও সঙ্গত কারণ ছাড়া কারও সঙ্গে বিরোধ বাধায় না। তিনি আলিনগরের চুক্তি ভেঙ্গে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইংরেজদের দায় ছাড় দিয়ে লেখেন, ...সম্ভবত কোনও গুরুত্বপূর্ণ কারণে নবাবের সঙ্গে বিরোধ করা ছাড়া তাদের কোনও উপায় ছিল না। ...অবশ্য এ বিষয়ে আমার কাছে সঠিক কোনও তথ্য নেই তবে মনে হয় সম্ভবত নবাব(শর্ত অনুযায়ী) টাকা পয়সা দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন এবং অকারন দেরি করছিলেন।'
পুর্ণিয়ার নবাব শওকত জঙ্গের সঙ্গে বিজয়ী হয়ে সিরাজ মোহনলালকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন গোলাম হোসেনে আর তার পরিবারের কোনও অনিষ্ট না হয়, তারা যেন নির্বিঘ্নে, নিরাপদে চলে যেতে পারেন। সিরাজের নির্দেশে তিনি নিরাপদে বেনারস তাঁর মামা ও ভাইদের সঙ্গে মিলিত হন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ তো দূরস্থান এই বদান্যতার জন্য গোলাম হোসেন সিরাজকে ধন্যবাদ তো জানানই নি এ প্রসঙ্গে তিনি পরে লেখেন, তাঁরা অত্যাচারী নবাবের হাত থেকে ভাগ্যক্রমে মুক্তি পেয়েছেন। তাঁর আরও অভিযোগ সিরাজ নাকি জগতশেঠকে সুন্নত করার হুমকি দিয়েছিলেন, যা তৎকালীন কোন তথ্যেই সমর্থিত নয়।
বিশদে লেখার এখানে অবকাশ নেই, উতসাহীরা সুশীলবাবুর বইটা আরও বিশদের জন্য পড়ে নিতে পারেন।
পরের কিস্তিতে রিয়াজ লেখক গোলাম হোসেন সালিম এবং করম আলির বয়ান।

নবাবি আমল জানতে পাঠ্যতালিকা

ইজ্জত চলে যাওয়ার আশংকায় অনেক বন্ধু অপ্রকাশ্যে আলাদা করে ব্রিটিশ-পূর্ব(মূলত নবাবি আমল) সময়ের পাঠ্যসূচী জানতে চেয়েছিলেন।কাউকে বিব্রত না করার জন্য কোন ট্যাগ না করেই আমার জ্ঞানানুযায়ী বইএর তালিকা দিলাম। এর বাইরে কারীর যদি কোন চেনা/অচেনা বই জানা থাকে/মনে পড়ে, দয়া করে দিতে পারেন। কৃতজ্ঞ থাকব।
যদুনাথ সরকার হিস্ট্রি অব বেঙ্গল, দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন, দ্য ফল অব মুঘল এম্পায়ার, শিবাজী (বাংলা), মিলিটারী হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া, দ্য রানি অফ ঝাঁসী, ফেমাস ব্যাটেল্‌স্‌ অফ ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি, শিবাজী এন্ড হিজ টাইম, ক্রোনোলজী অফ ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি
আবদুল করিম মুর্শিদকুলি এন্ড হিজ টাইম
কালিকিঙ্কর দত্ত আলিবর্দি এন্ড হিজ টাইমস
কালিকিঙ্কর দত্ত সিরাজুদ্দৌলা
ব্রিজেন গুপ্ত সিরাজুদৌলা এন্ড ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
রমেশচন্দ্র মজুমদার বাংলাদেশের ইতিহাস
দিনেশচন্দ্র সেন বৃহতবঙ্গ
উইলিয়াম উইলসন হান্টার দ্য এনালস অব রুরাল বেঙ্গল
আলেকজান্ডার ডাও, দ্য হিস্টোরি অব হিন্দোস্তানঃ ফ্রম দ্য ডেথ অব আকবর টু দ্য কমপ্লিট সেটলমেন্ট অব দ্য এম্পায়ার আন্ডার আওরঙ্গজেব
সৈয়দ গোলাম হোসেন সিয়ারুল মুতাক্ষরিন
গোলাম হোসেন সালিম রিয়াজুস সালাতিন
সালিমুল্লাহ তারিখই বাংলা
য়ুসুফ আলি আহবালই মহব্বতজঙ্গ
করমআলি মুজফফরনামা
সুজন রায় ভাণ্ডারী খুলাসাতউসরাওয়ারিখ
রায় ছত্রমন চাহার গুলশন
ভারতচন্দ্র অন্নদামঙ্গল
রামপ্রসাদ কালীকীর্তন এবং বিদ্যাসুন্দর
গঙ্গারাম মহারাষ্ট্র পুরাণ
রামেশ্বর শিবায়ন
কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার বর্গীদের পটভূমিকায় চিত্রচম্পূ
সুশীল চৌধুরী ফ্রম প্রস্পারিটি টু ডিক্লাইন, এইটিনথ সেঞ্চুরি বেঙ্গল
কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় বাঙ্গালার ইতিহাস, নবাবী আমল
নিখিলনাথ রায় মুর্শিদাবাদ কাহিনী, মুর্শিদাবাদের ইতিহাস, জগতশেঠ
জে ডব্লু টি ওয়ালস, হিস্ট্রি অব মুর্শিদাবাদ ডিস্ট্রিক্ট
পি সি মজুমদার, দ্য মসনদ অব মুর্শিদাবাদ,
এ সি ক্যাম্পবেল, গ্লিম্পসেস অব বেঙ্গল
বি এন ব্যানার্জী বেগমস অব বেঙ্গল,
প্রাক-পলাশী বাংলা, সুবোধ কুমার মুখোপাধ্যায়
বেঙ্গল নবাবসএ য়ুসুফ আলির আহবাল-ই-মহব্বতে জঙ্গ, যদুনাথ সরকারের অনুবাদে
দেওয়ান কার্তিক চন্দ্র রায় ক্ষিতীশ বংশাবলীচরিতএ
বাংলায় ব্যাঙ্কিং হরিশ চন্দ্র সিংহ
অভয়পদ মল্লিক হিস্ট্রি অব বিষ্ণুপুররাজ
ইনায়েতুল্লা আহকমই আলমগিরি
বেটা ফ্রান্সিস এবং এলিজ কেয়ারি সম্পাদিত দ্য ফ্রান্সিস লেটার্স
জে এইচ লিটল দ্য হাউস অব জগতশেঠস
কে এম মহসিন, আ বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট ইন ট্রাঞ্জিশনঃ মুর্শিদাবাদ
প্রতিভারঞ্জন মৈত্র মুর্শিদাবাদের ইতিহাস
সোমেন্দ্রচন্দ্র নন্দী বন্দর কাশিমবাজার, দ্য লাইফ এন্ড টাইমস অব কান্তবাবু
বাংলার ইতিহাস(অষ্টাদশ শতাব্দী) - নবাবী আমল, কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়
নরেন্দ্র কৃষ্ণ সিংহ - হিস্টোরিয়ান এজ এন আরকাইভিস্ট, মেদিনীপুর সল্ট পেপার্স, হিস্ট্রি অব বেঙ্গল, ইকনমিক হিস্ট্রি অব বেঙ্গল - ফ্রম প্লাসি টু পার্মানেন্ট সেটলমেন্ট, ফোর্ট উইলিয়াম - ইন্ডিয়া হাউস করসপন্ডেন্স, হায়দার আলি, হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া। সঙ্গে অবশ্যই পড়তে হবে কুনাল সিংহ, শমিতা সিংহ সম্পাদিত - অধ্যাপক নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহঃ স্মরক গ্রন্থটি।
ড.আবদুল করিম, বাংলার ইতিহাস: সুলতানী আমল এবং বাংলার ইতিহাস:মুঘল আমল

উচ্চ প্রযুক্তি হিসেবে যা ব্যবহার করছি তা রাষ্ট্রের ভরতুকিতে

শুধু ভাবতে বলব কোন একদিন যদি এমন ব্যবস্থা তৈরি হয় ৫০ ক্রোশের বাইরে সেই অঞ্চলের উৎপাদন বিক্রি করা যাবে না দূষণ ইত্যাদির কারণে, তাহলেই রাষ্ট্রীয় মদতে কেন্দ্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা সম্বল করে বেঁচে থাকা সব কর্পোরেট গুমোর ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে।
আজ আমরা ভদ্ররা উচ্চ প্রযুক্তি হিসেবে যা ব্যবহার করছি তা রাষ্ট্রের ভরতুকিতে।
সেই ভরতুকি যদি কোন দিন উঠে যাওয়ার অবস্থা হয়, তাহলে কি হবে ভাবতে অনুরোধ করছি।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - কেন্দ্রিভূত উৎপাদন ব্যবস্থার ভবিষ্যত - বড় পুঁজি রাষ্ট্রীয় মদত ছাড়া কোন মৌলিক প্রযুক্তি/পণ্য বানিয়ে দেখাক

উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম দুই নেতাArupsankarদা Rafiqদা ভাবছেন ১৭৫৭ হয়ত যাওয়া যাবে না। আমাদেরই মানিয়ে নিতে হবে। আমরা কোনোটাতেই কোন নিশ্চিন্ত জবাব দিচ্ছি না, শুধু কয়েকটা প্রতিক্রিয়া-
১) কখোনো কখোনো কোন কোন সময়কে মনে হয় অপরিবর্তনীয়। ২০০০ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বসে কেউ যদি বলত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হবেন, আর সিপিএম ৫০টার বেশি আসন পাবে না, বিলয় হয়ে যাবে বাংলা থেকে, পার্টি দপ্তরও খোলার মানুষ থাকবে না দলে, তাহলে তার মাথার সুস্থতা সম্পর্কে অবাম মানুষও সন্দিহান হত।
২) মানুষের ইতিহাস, বিকেন্দ্রিত উৎপাদন ব্যবস্থা কম করে ১০ হাজার বছরের ইতিহাস। লুঠেরা কেন্দ্রিভূত উৎপাদন ব্যবস্থা, মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রযুক্তি এসেছে আড়াইশ বছর, যা বিশ্বের ইতিহাসে মানব সমাজের বিকাশের তুলনায় কোন সময়ই নয়। বিকেন্দ্রিত ব্যবস্থা টিকে ছিল আজও আছে। আজও বলা যাচ্ছে না কেন্দ্রিভূত উৎপাদন ব্যবস্থা আগামী দশ হাজার বছর টিকবে কি না। ব্যবস্থার জন্মদাতা ইওরোপ এই ব্যবস্থা থেকে সরতে শুরু করেছে; দূষণ নিয়ে তারা যে কড়াকড়ি করছে সে উদ্যম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া সময়ের অপেক্ষা। মানুষ অফ দ্য গ্রিড বাঁচতে চাইছে। বিষ চাষের মৃত্যু ঘণ্টা মোটামুটি বেজে গিয়েছে।
আমরা হয়ত এই ব্যবস্থায় এতই কন্ডিশনড হয়ে আছি যে এর বাইরে বেরোনো যায়, এটাই ভাবতে পারছি না।
এটাই মানসিকতা তৈরি হবে কম্পিউটার শিল্পে, যা আদতে সামরিক ব্যবস্থা চালাবার আর মানুষ নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি, লক্ষ লক্ষ যুবক/যুবতী ছাঁটাই হবার পরে।
আর কয়েক দশক মাত্র।
৩) যে রাষ্ট্র পোষিত উতপাদন ব্যবস্থা রয়েছে তা সামাজিক বিকেন্দ্রিভূত উৎপাদন ব্যবস্থাকে প্রতিযোগী মনে করে। তাকে টিকতে দিতে চায় না। কেননা বিকেন্দ্রিত উৎপাদন ব্যবস্থা তার গুণাগুণ সবার সামনে পেশ করেছে, কেন্দ্রিভূত উৎপাদন ব্যবস্থা রয়েছে মুষ্টমেয়র হাতে, সুখের জন্য আর লুঠেরা খুনি সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্যে।
৪) আমরা ১৭৫৭র আগে যাব, না এই সময়টাকে ১৭৫৭ করে নেব, সেটা দ্যাখা যাবে। এটা প্রমাণিত বাংলার জোর বাংলার পরম্পরার প্রযুক্ত্‌ বাংলার পরম্পরার উৎপাদন ব্যবস্থা - তার আর্থিক পরিমানেই প্রমানিত। তাকে চাইলেও কর্পোরেট মারতে পারছে না।
৫) আমাদের শুধু ঘাটতি রয়েছে বিশ্ব বাজারে পৌঁছনোর - সেখানে পৌঁছতে পারলে ঠিকই আমরা কর্পোরেটদের মোকাবিলা করতে পারব - গ্রামগুলোকে মিলতে হবে - এটা কর্পোরেট চায় না - কেননা এই প্রক্রিয়ার সাফল্যে তাদের মৃত্যু ঘন্টা বাঁধা আছে।
আমরা রাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া হাজার হাজার বছর বেঁচে ছিলাম, আছি থাকব। কর্পোরেটরা পারবে না। এটাই বাস্তব।
আজকে বাজারে উচ্চ প্রযুক্তি হিসেবে যা চলে তা মূলত সামরিক কারণে (উপনিবেশ তৈরি আর মানুষ মারার জন্যে) আর রাষ্ট্রীয়(মানুষকে নিয়ন্ত্রিত করার জন্যে) তৈরি হয়। তারপরে সেগুলি পণ্য হিসেবে বাজারে আসে এবং উচ্চমুনাফায় বিক্রি হয়, কারণ তার গবেষণার খরচ রাষ্ট্রই জুগিয়েছিল মানুষের গাঁট কেটে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে চালু একটা প্রযুক্তি আর তার পণ্য তারা রাষ্ট্রের(আদতে সামরিক) দয়া ছাড়া বানিয়ে দেখাক।
মেনে নেব।
আমরাই অতীত ছিলাম, আমরাই ভবিষ্যৎ হব।
এটাই বাস্তব।
সোভিয়েত, আমেরিকাকেও এক সময় অজেয় মনে হত।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - লুঠের মানচিত্র

মশাইরা, সমাজপতিরা, রাষ্ট্র পরিচালকেরা, হুজুরেরা, দেখুন আপনাদের ক্ষমতায় যাওয়ার পরের কীর্তিকাহিনী। বাংলা ডুবেছে বঙ্গোপসাগরে আর ইওরোপ উড়াল দিয়েছে গগণপানে।
১৯১৩কে ভিত্তিবর্ষ ধরে ব্রিটেনের ঐ সময়ের জিডিপির ইতিবৃত্ত।
কোন সমৃদ্ধশালী বাংলার ধ্বংসাবশেষের ওপর বসে পশ্চিম ইওরোপ তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল –
১৭২০-২১ – ২.১, ১৭৬০-৬১ – ২.৬, ১৭৭০-৭১ – ৩.৩,, ১৭৮০-৮১ – ৩.৫, ১৭৯০-৯১ – ৪.৬, ১৮০০-০১ – ৫.৭, ১৮১০-১১ – ৭.১, ১৮২০-২১ – ৯.৭, ১৮৩০-৩১ – ১৮.৩, ১৮৪০-৪১ – ১৯.৬।
১৭৫৬য় বাংলার জিডিপি ৬+।
লক্ষ্য করুন ১৮০০র পর থেকে ইওরোপের জিডিপি ৫এর উর্ধমুখী আর ৩০এর পর লাফিয়ে দুই অংক ছাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে কুড়ির ঘরে প্রবেশ করেছে। (সুত্রঃ বিনয় ঘোষ, বাঙলার নবজাগরণ)

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - কেন আমরা ১৭৫৭র আগে যেতে চাই - আজও আপনারা ইওরোপিয় স্বার্থ দেখছেন নির্লজ্জভাবে

মশাইরা, সমাজপতিরা, রাষ্ট্র পরিচালকেরা, হুজুরেরা, 
 আমরা বাংলার কারিগরেরা চাষীরা একদা বাংলাকে করে তুলেছিলাম বিশ্বের কাছে স্বর্গ রাজ্য। বিশ্বের প্রত্যেক দেশের নাগরিক বাংলায় আসত পণ্য কেনার জন্যে। পলাশীর পরে আপনাদের পূর্বপুরুষেরা আমাদেরকে বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে নিজেরা রাজা উজির হয়ে সিংহাসন দখল করেছেন - বকলমে সাদা-লালমুখোরাই আজও আমাদের শাসন করছে।
আমরা যখন বাংলার উৎপাদন ব্যবস্থার ধারক ছিলাম, সে সময় বাংলা সম্বন্ধে কারা কি বলেছে মন দিয়ে পড়ুন -
১) বাংলা ছিল মুঘলদের কাছে জিন্নতুল বিলাদ, সুবাগুলোর মধ্যে স্বর্গ ভূমি।
২) ঔরঙ্গজেব তার প্রত্যেক চিঠিতে বাংলাকে বলতেন ভারতের স্বর্গ।
৩) ১৬৬০এ বার্নিয়ে বলছেন, বাংলা এতই সম্পদশালী যে প্রবাদ আছে বাংলায় (সম্পদ) ঢোকার রাস্তা অসংখ্য কিন্তু বেরোবার রাস্তা নেই।
৪) আলেকজান্ডার ডাও বলছেন, আন্তর্জাতিক দাঁড়িপাল্লা বাংলার দিকেই ভারি ছিল, তখন বাংলায় একমাত্র পাত্র(sink) যেখানে সোনাদানা এসে জমত, আর কিছুমাত্র কখনও বেরোত না।
৫) ১৭৩৫ সালে লন্ডনের কোম্পানির পরিচালক সমিতি লিখছে - সারা ভারতবর্ষের মধ্যে বাংলাই যে সবচেয়ে সস্তাগণ্ডার দেশ শুধু তাই নয়, সারা ভারতের মধ্যে এটাই সবচেয়ে প্রাচুর্যের দেশ।
(পলাশীর অজানা কাহিনী, সুশীল চৌধুরী)
বাংলাভাগ, আপনারা যাকে স্বাধীনতা বলেন, তার সত্তর বছর কেটেছে, তিন তিনটে প্রজন্ম মরে হেজে গিয়েছে। আজও ওপরের পাঁচটি বর্ণনার ধারেপাশে বাংলাকে পৌঁছে দিতে পারেন নি। তা সত্ত্বেও আপনাদের লজ্জা নেই ইওরোপিয়-আমেরিকয় দালালি করে চলেছেন নির্লজ্জ মুখে।
আমরা ১৭৫৭র আগে- ফিরে যেতে চাইলে মহা দোষ হল?
জয় বাংলা।

১৭৫৭র জেন্টলম্যানস ম্যাগাজিনে সামগ্রিক বাংলার মানচিত্র।

কৃতজ্ঞতা Uddipan Nath

হান্টার এবং তৎকালীন বাংলার বাস্তবতা

সাম্রাজ্য তাত্ত্বিক হান্টার মশাই নাকি বাংলায় দুটি জিনিসের অভাব দেখেছিলেন,
১) বর্ণ জাতিগুলির মধ্যে সহযোগিতার অভাব,
২) প্রয়োজনাতিরিক্ত উৎপাদনে অনীহা।
প্রথমটা নিয়ে শুধু বলব – ১৮৩৬এর উইলিয়াম এডামের শিক্ষা সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে বাংলার ১ লক্ষ গাঁইয়া পাঠশালায় উচ্চ আর নিম্নবর্ণের সন্তানেরা পাশাপাশি বসে পাঠ নিচ্ছে, বরং পাঠশালায় উচ্চবর্ণের তুলনায় শূদ্র পড়ুয়ার সংখ্যা অনেক অনেক গুণ বেশি। 
এবারে দ্বিতীয় চলকটা।
ঠিকই বাংলার উৎপাদকেরা আজকের সর্বগ্রাসী কর্পোরেটদের মত বিদেশি বাজারের দিকে তাকিয়ে উৎপাদন কররেতেন না।অতিউৎপাদন না হওয়া সত্ত্বেও বাংলায় হান্টারদের পূর্বপুরুষ সহ গোটা বিশ্বকে মাল কিনতে পলাশী পূর্বের দেড়শ বছর ধরে সোনা রূপা আর দামি রত্ন বয়ে নিয়ে আনতে হচ্ছে। বাংলার কারিগরদের উৎপন্ন দ্রব্য একচেটিয়াভাবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যাচ্ছে।
বাংলার আর্থিক পশ্চাদপদতার পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক মশাই সমস্ত দায় চাপিয়ে দিয়েছেন উপনিবেশের প্রজাদের ঘাড়ে আর নিজেদের তৈরি লুঠেরা খুনি সাম্রাজ্যের লুঠের কথা লুকিয়েছেন ব্রিটিশ উন্নয়নের ঢক্কা নিনাদে। তাঁর তত্ত্ব নির্ভর করে পরবর্তী ঐতিহাসিক-সমাজতাত্ত্বিকেরা বাংলার সমাজ বিশ্লেষণ করেছেন।
সেই (ঔপনিবেশিক) ট্রাডিশন সমানে চলেছে।

Sunday, February 11, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - সমৃদ্ধি কারে কয়

বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে সরকারি ভাষ্যে শুনে আসছি দিনাজপুর পিছিয়ে পড়া একটি জেলা। ঔপনিবেশিক তত্ত্ব অনুসারে এই জেলায় দূষণ ছড়ানো সম্পদ লুঠেরা বড় শিল্প নেই তাই নাকি পিছিয়ে পড়া।সম্প্রতি ওয়াপাগের সদস্য দল বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সংঘের পক্ষে থেকে আবাদ উদ্যম নেওয়া হয়েছে। সে বিশদ বর্ণনা পরে জানানো যাবে। 
সেই কাজে উষাহরণের মধুপুরের চাষী-কারিগর, আমাদের সদস্য মাঝ বয়সী চল্লিশ বছরের ঊষাহরণের দলের মাথা রাজবংশী সমাজের রবির(রবীন্দ্রনাথ দেবশর্মা) চাষের সহায় সম্পদ-ধনসম্বলের তথ্য নিচ্ছিলাম। এই তথ্য আমাদের কোন দিকে এগোতে সাহায্য করে দ্যাখা যাক।
মোট জমির পরিমান ৬এর বেশি বিঘে।ভিটাজমি(উঁচু জমি, বাস্তু নয়) ১ বিঘে। ভাগের পুকুর ৩ বিঘের(লিজ দেওয়া আছে)।
আম গাছ ২০টা, কাঁঠাল ১টা, পেয়ারা ১টা, জাম ৫টা, নারকেল ৩টে, তাল গাছ একটা, বাঁশ বাগান ৫ কাঠার, কলা গাছ ৩০টা, নিম গাছ ২টো।
গরু ৬টা, দুধেল ১টা। ছাগল ৬টা দুধেলা ১টাচ। হাঁস ৮টা- সব কটা ডিম দেওয়া - রোজ ডিম পান তারা।
পুকুর যেহেতু লিজে দেওয়া, তাই মাছের হিসেব করা হয় নি।
রবির ইচ্ছে নিম পাতা শুকনো থেকে শুরু করে দেশি পদ্ধতিতে কালো ধানের চাষ আর ওষুধের গাছের চাষ করার। আর সঙ্গে কপি আর ফসল করার।শুকনো ফসল বিক্রি করার। তার ইচ্ছা জৈব চাষের। আমরা বলি দেশি চাষের।
এই রকমের ছোট চাষীতেই দিনাজপুর ভর্তি।কুনোর, পতিরাজ বা ধনকৈল হাটে গেলেই মালুম হবে এই এলাকার কৃষি বৈচিত্র্য।
যে মানুষগুলো গায়ে গতরে খেটে, পূর্বজর জ্ঞান আর আর্জিত দক্ষতা অবলম্বন করে, প্রকৃতির সূত্র গুলি থেকে পাঠ নিয়ে আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেন, তাঁদের এই সাধারণ সম্পদকে যদি সমৃদ্ধি না বলি, তাহলে বড় পুঁজির সমৃদ্ধির মানের পাশে আমরা নেই।
ছোট চাষীরা, কারিগরেরা ক্রমশঃ উদ্যমী হচ্ছেন।
আর কিছু দিনের অপেক্ষা।

Friday, February 2, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - মুঘল সাম্রাজ্য কৃষক-কারিগরদের শেষ পালক - ফৌজদারের শপথেও কৃষক রক্ষার কথা

{সুবাদার শপথেও কৃষকদের পালনের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হত With my good behaviour to the peasants I will try my best to increase the cultivation and population}
সুবার সুবাদার, উজির, বক্সীর পরের গুরুত্বপূর্ণ পদটি হল ফৌজদারের। মানুচির মতে সুবায় ফৌজদার দপ্তরের ভয়ে জমিদারেরা রাজস্ব দিত। ফৌজদারও পাদশাহ নিয়োগ করতেন এবং তার চাকরি যেত সম্রাটের ইচ্ছেয়। কখোনো কখোনো দেওয়ানকে ফৌজদারির অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হত। অষ্টাদশ শতের প্রথম দিকে মুর্শিদিকুলিখাঁ একাধারে দেওয়ান অন্যদিকে ফৌজদারও।
ফৌজদারের দুটি দায়িত্ব, প্রাথমিকিভাবে ছোট সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নিয়ে চাকলায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা। দ্বিতীয় চাকলার খালসা জমির রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা। শেষের দায়িত্বে তার কাজ আমিলের আমলগুজারের সমান। চাকলার দায়িত্ব নেওয়ার আগে ফৌজদারকে শপথ বাক্য পড়ানো হত।
১১৩২ বাংলা সনে(১৭২৫ খ্রি) যশোরের জনৈক ফৌজদার মীর মহম্মদ মেহদি এই ধরণের শপথবাক্য পাঠ করেন Taking the charge and administration of chakla Jessore I confess and agree to take proper care of the above mentioned parganas (i.e. parganas included into the chakla Jessore) and would see them mostly populated and the revenues collected from the above mentioned places in conformity with the will of the peasants would be sent to the government treasury. With my good behaviour to the peasants I will try my best to increase the cultivation and population.
If I fail to do above mentioned duties I hold myself fully responsible for the consequences according to the laws
of the government।

কৃষি ও কৃষককে রক্ষা করাকে বাংলার নবাবেরা তাঁদের কর্তব্য বলে মনে করতেন

ব্রিটিশদের হাতে বাংলা লুঠ তত্ত্বের বিরোধী ভারতের ইতিহাস লেখার কেম্ব্রিজ ঘরানার তাত্ত্বিক পি জে মার্শালের অনুগামী, ঐতিহাসিক সুবোধ কুমার মুখোপাধ্যায় ‘প্রাক-পলাশী বাংলা’ বইতে লিখছেন...
...মুর্শিদকুলি খাঁ পতিত ও অনাবাদী জমি চাষের আওতায় আনার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। তিনি ছোট ছোট কৃষকদের উৎসাহদানের জন্য তাঁর রাজস্ব বিভাগের কর্মচারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কৃষকদের হালের গরু আর মহিষ কেনার জন্য সরকারি ঋণ ব্যবস্থা করেন। দুর্ভিক্ষের সময় আনাবৃষ্টির সময় শস্যের ক্ষতি হলে তিনি কৃষকদের খাজনা মকুব করে দিতেন। কৃষি জমিতে যাতে ভালভাবে চাষ হয়, তার জন্য তিনি কৃষকদের কৃষি ঋণ (তাকাবি) দেওয়ারও নীতি অনুসরণ করেছিলেন।
মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলার জমিদারদের ওপর কড়া নজর রাখতেন। কৃষক বা রায়তের ওপর অত্যাচার হলে জমিদার সহজে নিস্তার পেত না। এজন্য তাঁর সময়ের জমিদারেরা সব সময়ে সন্ত্রস্ত থাকত। জমিদারের উকিল নবাবের দরবারের আশেপাশেই বিক্ষুব্ধ রায়তের খোঁজ করত। এ রকম কোন বিক্ষুদ্ধ রায়তের সন্ধান পেলে নবাবের অভিযোগ পেশ করার আগেই উকিল তাকে খুশি করে বিরোধ মিটিয়ে নিত।
সুজাউদ্দিন ও আলিবর্দি (মুঘলদের কৃষি নীতি অনুসরণ করে) বাংলার কৃষকদের রক্ষা করার নীতি অনুসরণ করেছিলেন। তাঁরা কৃষকদের ওপর নজর রাখতেন। মারাঠা আক্রমনের সময় আলিবর্দি কৃষির পুনর্গঠনে মন দিয়েছিলেন। বাংলার বিদ্ধস্ত গ্রাম ও কৃষি গড়ে তোলা ছিল তাঁর জীবনের শেষ কাজ। সমসাময়িকদের লেখা থেকে এ তথ্য জানা যায়। কৃষি বাংলার জাতীয় সম্পদ। কৃষি ও কৃষককে রক্ষা করাকে বাংলার নবাবেরা তাঁদের কর্তব্য বলে মনে করতেন। এটা ছিল এ যুগের রাষ্ট্রনীতি।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - বাংলা আর বাঙালির শূদ্র প্রযুক্তি লোহা-ইস্পাত শিল্প - উৎপাদনের গুণমান হরবল্লভ দাস এবং জনার্দন কর্মকারের প্রতি প্রণাম

কাটরার দক্ষিণ-পূর্বদিকে দুইটি অশ্বত্থতরুর, অথবা একটি অশ্বথতরুর দুইটি সংলগ্ন কাণ্ডের মধ্যস্থলে এক বিশাল কামান অবস্থিতি করিতেছে। এই কামানের নাম জাহানকোষা বা জগজ্জয়ী। এই স্থানে মুর্শিদকুলী খাঁর কামানাদি রক্ষিত হইত বলিয়া কথিত আছে। সেইজন্য এই স্থানটিকে আজিও সাধারণে তোপখানা কহিয়া থাকে। এই তোপখানার উত্তর দিয়া একটি ক্ষুদ্র নদী সর্পগতিতে আপনার ক্ষুদ্র কলেবরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গ তুলিয়া আপন মনে বহিয়া যাইতেছে। জাহানকোষা অনেকদিন পর্যন্ত ধরণীবক্ষে স্বীয় বিশাল বপু বিস্তার করিয়া অবস্থিতি করিতেছিল; ইহার পার্শ্বে অশ্বত্থ বৃক্ষ জন্মিয়া জাহানকোষাকে ভূতল হইতে কতকটা উর্ধ্বে উত্তোলন করিয়াছে।
কামানটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ১২ হাত হইবে। বেড় ৩ হাতের অধিক, মুখের বেড়টি ১ হাতের উপর। অগ্নিসংযোগ-ছিদ্রের ব্যাস ১৷৷ ইঞ্চি হইবে। কামানের গাত্রে ফারসী ভাষায় খোদিত ৯ খণ্ড পিত্তলফলক আছে। ৩ খণ্ড অশ্বত্থবৃক্ষের কাণ্ড মধ্যে প্রবিষ্ট, অবশিষ্ট কয়েকখানিও অস্পষ্ট হইয়া পড়িয়াছে।
পিত্তলফলকে বাঙ্গলার শাসনকর্তা ইসলাম খাঁর গুণবর্ণনা ও কামানের নির্মাণাব্দাদি খোদিত আছে। এইরূপ লিখিত আছে যে, এই জাহানকোষা সাজাহানের রাজত্বকালে ও ইসলাম খাঁর বাঙ্গলাশাসনের সময়, জাহাঙ্গীরনগরে দারোগা শের মহম্মদের অধীন হরবল্লভ দাসের তত্ত্বাবধানে জনাৰ্দন কর্মকার(এই জনাৰ্দনকে বেভারিজ প্রভৃতি জর্নাজন বলিয়া লিখিয়াছেন। পিত্তল-ফলকের লেখা এক্ষণে অস্পষ্ট হইয়াছে, ভাল করিয়া পড়িবার সুবিধা নাই; কিন্তু উহা জনাৰ্দন হওয়াই সম্ভব।- পাদটিকা) কর্তৃক ১০৪৭ হিঃ(১৬৩৭ সাল) ১১ই জমাদিয়স্ সানি মাসে নির্মিত হয়। ইহা ওজনে ২১২ মণ; ইহাতে ২৮ সের বারুদ লাগিয়া থাকে।
জাহানকোষাকে এক্ষণে হিন্দু-মুসলমান উভয় জাতিই সিন্দুরাদি লেপন করিয়া পূজা করিয়া থাকে। ঢাকায় ইহা অপেক্ষা আরও একটি বিশাল তোপ ছিল; তাহা এক্ষণে নদীগর্ভে পতিত। বিষ্ণুপুর প্রভৃতি স্থানেও বৃহৎ তোপের কথা শুনা গিয়া থাকে।
আমাদের দেশে পূর্বে যেরূপ শিল্পের উন্নতি হইয়াছিল, অনুসন্ধান করিলে, এখনও তাহার অনেক চিহ্ন দেখিতে পাওয়া যায়। বাঙ্গলার শিল্পের দিন দিন যেরূপ অবনতি হইতেছে, তাহাতে লোকে ইহার পূর্বশিল্পের কথা প্রবাদ বাক্য বলিয়া মনে করিবে।
মুর্শিদাবাদ-কাহিনী; নিখিলনাথ রায়
কাটরার মস্‌জেদ
(জাহানকোষা তোপ)

গত কাল ক্রুজের অনুষ্ঠানের আগে... আমার সাম্রাজ্ঞী...